মানুষের জীবনে আসলে কোন জিনিসটা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ? অর্থ, ক্ষমতা, বুদ্ধিমত্তা, নাকি অন্য কিছু?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা একবার এমন একটা পরীক্ষা শুরু করেছিলেন, যা ইতিহাসের দীর্ঘতম মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। এটাই হলো হার্ভার্ড গ্র্যান্ট স্টাডি – এক অসাধারণ বৈজ্ঞানিক যাত্রা। এই পরীক্ষায় অনেক মানুষের সারা জীবনের তথ্য পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

কারা জীবনে সফল হবে এটা বলে দেয়াটা কঠিন বা অসম্ভব মনে হতে পারে। একজন নির্দিষ্ট ব্যাক্তির জীবন নিয়ে ভবিষ্যতবানী করাটা খুব অসম্ভব মনে হলেও, একদল লোকের বা একটা জাতির ভবিষ্যৎ কি হবে তা বৈজ্ঞানিকভাবে বলে দেয়া যায়।

অনেকেই মনে করেন সফলতা একটা দূর্ঘটনার মত। কিন্তু ব্যাপারটা আসলে উল্টো। যারা জীবনে সফল হয়েছে তাদের দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষন করে উল্লেখযোগ্য কিছু আচরন দেখতে পেয়েছেন মনোবিজ্ঞানীরা।

কি ধরণের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল?

হার্ভার্ড গ্র্যান্ট স্টাডি হলো একটি দীর্ঘমেয়াদী (longitudinal) গবেষণা প্রকল্প, যেখানে কয়েকশো মানুষের জীবন শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত বছরের পর বছর ধরে অনুসরণ করা হয়েছে। লক্ষ্য ছিল একটাই — কোন বিষয়গুলো অনুসরণ করে একজন মানুষ সুস্থ, সুখী এবং সফল হয় সেটা বোঝা।

গবেষণার অংশগ্রহণকারীদের প্রতি বছর বিস্তারিত প্রশ্নমালা পূরণ করতে হতো। তাঁদের শারীরিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হতো, মানসিক অবস্থা মূল্যায়ন করা হতো, পারিবারিক জীবন ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের খোঁজ নেওয়া হতো এবং কর্মজীবনের উত্থান-পতনও রেকর্ড করা হতো। কার্যত একটি মানুষের পুরো জীবনের একটি বিজ্ঞানসম্মত “ডায়েরি” তৈরি করা হয়েছিল এই গবেষণায়।

শুধু তাই নয়, গবেষণাটি পরবর্তীতে বিস্তার লাভ করে। হার্ভার্ডের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বোস্টনের দরিদ্র পাড়ার তরুণদের নিয়েও আলাদা একটি অংশ পরিচালিত হয়, যা “গ্লুয়েক স্টাডি” নামে পরিচিত। দুটি গবেষণাকে একত্রিত করে সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে আসা মানুষের জীবনের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া গেছে এই পরীক্ষায়।

কবে এবং কারা এই গবেষণা শুরু করেছিলেন?

১৯৩৮ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এই গবেষণার সূচনা হয়। প্রথমে হার্ভার্ডের স্নাতক শ্রেণির ২৬৮ জন সুস্থ ও মেধাবী ছাত্রকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। মূল উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছিলেন ড. আরলি বক (Dr. Arlie Bock), যিনি হার্ভার্ডের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের প্রধান ছিলেন। উদ্যোগটির অর্থায়ন করেছিলেন উইলিয়াম টি. গ্র্যান্ট — একজন সফল ব্যবসায়ী, যার নামেই এই গবেষণার নামকরণ।

দশকের পর দশক ধরে এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন বিভিন্ন পরিচালক। তবে যিনি এটিকে সবচেয়ে বেশি পরিচিত করে তুলেছেন, তিনি হলেন ড. জর্জ ভেইলেন্ট (Dr. George Vaillant)। তিনি ১৯৬৬ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন এবং এর ফলাফল নিয়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছেন। বর্তমানে গবেষণাটি পরিচালনা করছেন ড. রবার্ট ওয়ালডিঙ্গার (Dr. Robert Waldinger), যার TED Talk এর উপস্থাপন এই গবেষণাকে বিশ্বব্যাপী কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।

উল্লেখযোগ্য একটি তথ্য হলো, এই গবেষণার কিছু অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫তম প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি — যদিও তাঁর নাম পরবর্তীতে প্রকাশ করা হয়েছে।

মানুষের সাফল্য সম্পর্কে কি আদৌ ভবিষ্যৎবাণী করা যায়?

এটাই ছিল এই গবেষণার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন — এবং প্রাপ্ত ফলাফল বিজ্ঞানিদের চমৎকৃত করেছে।

গবেষণা শুরুর সময় গবেষকরা ধরে নিয়েছিলেন যে শারীরিক গড়ন, বুদ্ধিমত্তা, পারিবারিক পটভূমি বা আর্থিক অবস্থা দেখে বলা যাবে কে সফল হবে। কিন্তু দশকের পর দশক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেল, চিত্রটা তার থেকে বেশি জটিল।

এই গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য দেখিয়েছে, কলেজ জীবনে কেউ কত ভাল ছাত্র ছিল, তার IQ কত ছিল, কিংবা তার পরিবার কতটা সম্পদশালী ছিল – এসব বিষয় দিয়ে ৪০-৫০ বছর পরে তিনি কতটা সুখী বা সফল হবেন, তা নির্ভরযোগ্যভাবে বলা যায় না।

যা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ –

গবেষণার সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হলো মানুষের জীবনের একটি অত্যন্ত সহজ, কিন্তু গভীর সত্য – সম্পর্ক

ড. ভেইলেন্টের ভাষায়, “সুখের সবচেয়ে বড় রহস্য হলো ভালোবাসা।” গবেষণায় বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে যাঁরা মধ্যবয়সে পরিবার, বন্ধু ও সমাজের সঙ্গে গভীর ও উষ্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে পেরেছেন, তাঁরা বার্ধক্যে শারীরিকভাবেও বেশি সুস্থ এবং মানসিকভাবেও বেশি প্রশান্ত ছিলেন।

এর পাশাপাশি গবেষণায় আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। যাঁরা কঠিন পরিস্থিতিতে ভেঙে না পড়ে মানিয়ে নিতে পেরেছেন, সেই মানসিক দৃঢ়তা তাঁদের দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতা ও সাফল্যে বড় ভূমিকা রেখেছে। যাঁরা নিজের কাজে অর্থ খুঁজে পেয়েছেন – শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য নয়, বরং সত্যিকারের সন্তুষ্টির জন্য কাজ করেছেন – তাঁরা জীবনে বেশি পরিতৃপ্তি অনুভব করেছেন। এমনকি শিক্ষার্থী বয়সে কতটা সামাজিক ছিলেন এবং মানুষের সঙ্গে মিশতে পারতেন – এই বিষয়টিও পরবর্তী জীবনের সুখ-স্বাস্থ্যের একটি ভালো ইঙ্গিত দিয়েছে।

সাফল্যের সংজ্ঞাটা বদলে গেল তাই –

গবেষণার একটি বড় অবদান হলো, এটি “সাফল্য” ধারণাটিকেই নতুনভাবে দেখতে শিখিয়েছে। পদ-পদবি বা ব্যাংক ব্যালেন্স দিয়ে পরিমাপ করা সাফল্য দীর্ঘমেয়াদে সুখের নিশ্চয়তা দেয় না। বরং, জীবনের শেষ বেলায় যাঁরা বলতে পেরেছেন “আমার কিছু প্রিয় মানুষ ছিল, আমি ভালোবেসেছি এবং ভালোবাসা পেয়েছি” — তাঁরাই আসলে সবচেয়ে সমৃদ্ধ জীবন যাপন করেছেন।

হার্ভার্ড গ্র্যান্ট স্টাডি অনুযায়ী শৈশবের গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস

হার্ভার্ড গ্র্যান্ট স্টাডি পৃথিবীর দীর্ঘতম মানব উন্নয়ন গবেষণাগুলোর একটি যা ১৯৩৮ সাল থেকে শুরু হয়ে ৮০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলেছে। এই গবেষণায় যা উঠে এসেছে তা অনেকটাই চমকপ্রদ। একজন বাচ্চাকে সফল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কিছু অভ্যাসের কথা শৈশবেই রপ্ত করার উপদেশ দিয়েছেন মনোবিজ্ঞানীরা।

১. ছোটবেলা থেকে কাজ করার অভ্যাস (Chores)

গবেষণার অন্যতম প্রধান তথ্য হচ্ছে – যে বাচ্চারা ছোটবেলা থেকে ঘরের কাজে অংশ নেয়, তারা বড় হয়ে দায়িত্বশীল, পরিশ্রমী এবং টিমওয়ার্কে দক্ষ হয়। কাজ করার মাধ্যমে তারা শেখে – “আমার অবদান গুরুত্বপূর্ণ।”

২. সম্পর্ক গড়ার দক্ষতা

গবেষণার প্রধান পরিচালক Robert Waldinger বলেছেন – সাফল্য ও সুখের সবচেয়ে বড় ভবিষ্যদ্বক্তা হলো সম্পর্কের গুণমান। শৈশব থেকে বন্ধু, পরিবার ও শিক্ষকের সাথে গভীর সম্পর্ক রাখার অভ্যাস পরবর্তী জীবনে মানসিক স্বাস্থ্য ও ক্যারিয়ার দুটোই ভালো রাখে।

৩. কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা (Resilience)

যে বাচ্চারা ছোটবেলায় ছোটখাটো ব্যর্থতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে শেখে, পড়ে গিয়ে আবার উঠতে শেখে, তারা বড় হয়ে চাপের মধ্যেও স্থির থাকতে পারে।

৪. পড়ার ও শেখার আগ্রহ

কৌতূহলী মন এবং নিজে থেকে শেখার ইচ্ছা – এটা শুধু একাডেমিক সাফল্য নয়, বরং জীবনের যেকোনো পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি করে। যারা পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে না সে সকল বাচ্চারা বড় হয়ে সুখী বা সফল হতে পারে না।

৫. আবেগ নিয়ন্ত্রণ শেখা (Emotional Regulation)

রাগ, হতাশা বা দুঃখ- এগুলো সুস্থভাবে প্রকাশ করতে শেখা। গবেষণায় দেখা গেছে যারা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তাদের সম্পর্ক ভালো থাকে এবং কর্মজীবনেও এগিয়ে যায়।

৬. কৃতজ্ঞতার অভ্যাস (Gratitude)

যা আছে তার জন্য কৃতজ্ঞ থাকার মানসিকতা শৈশব থেকে গড়ে উঠলে মানুষ বড় হয়ে অনেক বেশি সন্তুষ্ট ও সুখী জীবনযাপন করে।

সবচেয়ে বড় উপলব্ধি

গ্র্যান্ট স্টাডির মূল বার্তা — “Good relationships keep us happier and healthier.” সাফল্য মানে শুধু টাকা বা পদ নয় – সুস্থ সম্পর্ক, মানসিক স্বাস্থ্য এবং জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়াটাই আসল সাফল্য।

হার্ভার্ড গ্র্যান্ট স্টাডি (The Harvard Grant Study): সুখ ও সাফল্যের রহস্য সন্ধানে ৮৫ বছরের যাত্রা 1

শৈশবে এই অভ্যাসগুলো গড়ে তুলতে পারলে একটা বাচ্চা শুধু “সফল” নয়, সত্যিকারের সুখী মানুষ হয়ে উঠতে পারে।

হার্ভার্ড গ্র্যান্ট স্টাডি আমাদের শেখায় যে, জীবনের সফলতার কোনো সহজ ফর্মুলা নেই। আমরা যে সমাজে বাস করি, সেখানে প্রতিযোগিতা, সম্পদ আর স্বীকৃতির পেছনে দৌড়ানোকে সাফল্য বলে ধরা হয়। কিন্তু ৮৫ বছরের এই বিশাল পরীক্ষা আমাদের সামনে একটি অন্যরকম সত্য উন্মোচন করেছে।

মানুষের জীবনকে সত্যিকার অর্থে সুন্দর করে তোলে তার সম্পর্কগুলো – পরিবারের সঙ্গে, বন্ধুর সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে।

এই সত্য হয়তো নতুন নয়। কিন্তু বিজ্ঞান যখন ৮৫ বছরের তথ্য দিয়ে তা প্রমাণ করে – তখন এর গুরুত্ব আর উপেক্ষা করার উপায় থাকে না।