মুসা ইবনে মান্নান, কেপি ইমন বা কিশোর পাশা ইমন – এই তিন নামেই অনলাইনে পরিচিত লেখক। আমি এই প্রথমবার তার লেখা কোন একটা বই পড়লাম। বেশ অনেকদিন হয়েছে আমি থ্রিলার পড়া ছেড়ে দিয়েছিলাম। সর্বশেষ পড়েছি বাদল সৈয়দের কিছু বই, এরপর এইবার কেপির এই বিশাল উপন্যাস।
থ্রিলার পড়তে আসলে ভালো লাগত যে বয়সটায় সেটা হয়ত পেরিয়ে এসেছি। অথবা যারা বাংলা থ্রিলার লেখেন তাদের লেখায় সেই ধার পাই না। থ্রিলার মানেই খালি মারামারি কিভাবে করেছে সেটার বর্ননা নয়। গল্পে আটকে যাবার উপদান থাকতে হয় আর থাকতে হয় ভাষার প্রাঞ্জলতা। কেপির ‘ছারপোকা” উপন্যাসে আমি দুটোই খুঁজে পেয়েছি।
লেখক দুই ভাবে কোন উপন্যাস লিখতে পারেন। প্রথম ভাবে নিজের সমস্ত আবেগ বিসর্জন দিয়ে চরিত্র বর্ননা করে এবং তাদের মাঝ দিয়েই সমাজের কথা বলাতে, আর দ্বিতীয় অবস্থায় চরিত্রদের নিজের ফিলসফি অনুযায়ী ভাল বা খারাপ হিসেবে গড়ে তুলে। তাদের কাজকর্মে আর ভাষায় নিজের নৈতিকতা আর বিশ্বাসকে সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারেন।
কেপি দ্বিতীয় পন্থা অবলম্বন করেছেন। যেহেতু আমি লেখকের আর কোন বই পড়িনি তাই বলতে পারছি না এটি তার সেরা কাজ নাকি। গল্পের পটভূমি একজন নাস্তিক ব্লগার কে খুনের ঘটনা দিয়ে শুরু হলেও, একে একে এসে অন্যান্য ঘটনাও এখানে যুক্ত হতে থাকে। ঠিক মাঝ বরাবর গিয়ে ঘটনাগুলো যে একটা আরেকটার সাথে জড়িত সেটা একটা রূপ পেতে থাকে। এইখানে কেপি মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। সাধু… সাধু…অত্যান্ত উপাদেয় হয়েছে এই রেসিপি।
মুক্তিযুদ্ধের একশন বর্ননা করার সময় আমার অনেকবার মনে হয়েছে কেপি মাসুদ রানার কোন একশন দৃশ্যের কথা বর্ননা করছেন। দোষের কিছু না। মাসুদ রানা বাংলা সাহিত্যে একটা স্ট্যান্ডার্ড দাঁড় করিয়ে গেছে যেটা ভেঙে ফেলা খুব দুষ্কর।
বইয়ে অহেতুক প্রেমের কাহিনী আছে, যৌনতার বর্ননা আছে। আমার এই বয়সে এসে এইগুলোতে আর থ্রিল পাই না। তবে এই জিনিসগুল কেপি নিজস্ব দর্শন থেকে লিখেছেন। বাঙালী ট্যাবু ভাঙার একটা সচেতন চেষ্টা আমি দেখেছি। গল্পের প্রয়োজনে নয়, বরঞ্চ আমি পারি বলেই তিনি নিয়ে এসেছেন।
যে আইডিয়া নিয়ে এই বিশাল উপন্যাস কেপি দাঁড় করিয়েছেন তা কিছুটা আউট অব দ্যা বক্স চিন্তা থেকে এসেছে। একজন মুক্তিযোদ্ধাকেও যে যুদ্ধাপরাধের দোষে দোষী করা যায়, সেটা তিনি বলতে চেয়েছেন। কিছুটা সময় নিজেই জাস্টিফাই করার চেষ্টা করেছেন এই টাইগার চরিত্রকে আবার শেষে এসে হাল ছেড়ে তাকে নিয়তির মত মেনে নিতে বলেছেন পাঠককে।
কাহিনীর লুপহোল যাকে বলে, সেগুলো যদি আমি বাদ দেই তবে কেপি নিঃসন্দেহে একজন ভালো লেখক। তার চিন্তা-ভাবনা যথেষ্ট পরিষ্কার, তার মত লেখক আমাদের দরকার। বইটি আমার বেশ ভাল লেগেছে এবং অনেকদিন পরে দীর্ঘ একটা বই শেষ করে একটুও ক্লান্তি আসেনি।
লেখক: কিশোর পাশা ইমন।
ধরন: রহস্য/গোয়েন্দা থ্রিলার।
প্রকাশক: বাতিঘর প্রকাশনী।
কাহিনী: খুন হয়ে গেল ছদ্মনামে লেখালেখি করা জনৈক ‘নাস্তিক’ ব্লগার। হোমিসাইড ডিপার্টমেন্টের ডিটেকটিভ আসিফ আহমেদ সহকারীকে সঙ্গে নিয়ে নেমে পড়লো মাঠে। কল্পনাও করতে পারেনি কাদের বিরুদ্ধে লাগতে যাচ্ছে। আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার আসিফের পছন্দ নয়। অথচ ভবিতব্য এড়াতে পারলো কই? প্রাণ বাঁচাতে ট্রিগার চাপতে বাধ্য হলো দুঁদে গোয়েন্দা।
একুশ বছরের একটা মেয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে। নিরুপায় বাবা শরণাপন্ন হলেন উঠতি এক প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটরের। জোহান লস্কর যখন কেসটা নিলো, ব্যক্তিগত জীবনেও চলছে টানপোড়ন। কাঞ্চনপুরে পা রাখতেই শুনতে হলো হুমকি, “সময় থাকতে চইলা যান। পরে জান লইয়া ভাগতে পারতেন না।”
একাত্তরে অসমসাহসী যুদ্ধ করেছে টাইগারবাহিনী। কিন্তু রাজাকার হায়দারের সাথে মুক্তিযোদ্ধা কিবরিয়ার দহরম মহরম হয় কি করে? পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করতে চিত্রপটে এলো মুরং ওঝা, রহস্যময় আশ্রয়দাতা হাজীসাহেব, নিটোল সৌন্দর্যের অধিকারিণী সুমি।
একাত্তরে কাঞ্চনপুরে কি ঘটেছিলো যার জের টেনে আজকের দিনেও প্রাণভয়ে ছুটে পালাতে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাধারণ ছাত্রকে? ক্যামেরা নিয়ে মাঠে নামলো ‘ছিঁচকে’ রিপোর্টার জন। পেছনে লাগলো নির্মম, চৌকস এক সংগঠন। পড়তে শুরু করলো লাশ!
দেশবাসীর চোখ তখন আটকে আছে মাহেন্দ্রপুরের মহাযুদ্ধে।
মাত্র ছয়জন যোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে স্রেফ প্রখর বুদ্ধিমত্তা সঙ্গী করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আস্ত এক কোম্পানি সৈন্যের বিরুদ্ধে অসম লড়াইয়ে নামলো টাইগার। দিনশেষে বুঝতে পারলো, ষড়রিপুর বিরুদ্ধে যুদ্ধটা বন্দুকযুদ্ধের চেয়েও অনেক, অনেক বেশি কঠিন।
মুষ্টিমেয় কিছু সিভিলিয়ান শক্তভাবে দাঁড়ালো প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে।
“ছারপোকা : দ্য ব্যাটল অফ মাহেন্দ্রপুর” বইটি খুলতে যাচ্ছে এমন এক অধ্যায় যা বাংলাদেশে স্মরণ করা নিষিদ্ধ হয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধকে পণ্য বানানোর পর থেকে।
