মানুষ কোথা থেকে এল, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন পূর্ব আফ্রিকার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ২০১৭ সালে মরক্কোর জাবাল ইরহুদ থেকে পাওয়া জীবাশ্ম এই ধারণায় বড় ধাক্কা দেয়। নতুন গবেষণায় বলা হয়, মরক্কোর এই হাড়গুলো আমাদের নিজেদের প্রজাতির এবং আনুমানিক বয়স ৩ লাখ ১৫ হাজার বছর। ফলে এগুলো তখন পর্যন্ত জানা সবচেয়ে পুরোনো হোমো সেপিয়েন্স নমুনা হয়ে ওঠে।
আবিষ্কারের স্থান ও প্রেক্ষাপট
জাবাল ইরহুদ মারাকেশের প্রায় ১০০ কিলোমিটার পশ্চিমে একটি পরিত্যক্ত বারাইট খনি। এখানকার মানব জীবাশ্ম ও মধ্য প্রস্তর যুগের (Middle Stone Age) সরঞ্জাম ১৯৬০-এর দশক থেকেই পরিচিত ছিল। প্রধান গবেষক জাঁ-জাক ঊবলাঁ ১৯৯০-এর দশকে প্রথম সেখানে গিয়ে জায়গাটি মাটিচাপা অবস্থায় পান। পরে দীর্ঘ খননকাজ চালিয়ে নতুন নমুনা উদ্ধার করা হয়। এই খননের নেতৃত্বে ছিল জার্মানির লাইপৎসিগে অবস্থিত ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ইভলিউশনারি অ্যানথ্রোপোলজি। গবেষণাটি ২০১৭ সালের ৭ জুন নেচার জার্নালে প্রকাশিত হয়।
উদ্ধার হওয়া জীবাশ্মের মধ্যে ছিল অন্তত পাঁচজন ব্যক্তির করোটি, দাঁত ও দীর্ঘ হাড়।
আগের ধারণা কী ছিল
বেশিরভাগ গবেষক আগে মনে করতেন আমাদের প্রজাতির উৎপত্তি পূর্ব আফ্রিকায়, প্রায় ২ লাখ বছর আগে। ইথিওপিয়া থেকে পাওয়া ১ লাখ ৯৬ হাজার ও ১ লাখ ৬০ হাজার বছরের পুরোনো করোটি এবং বর্তমান মানুষের ডিএনএ-ভিত্তিক গবেষণাও এই ধারণাকে সমর্থন করত। জাবাল ইরহুদের নমুনা সেই সময়সীমাকে প্রায় এক লাখ বছর পিছিয়ে দেয়।
মিশ্র বৈশিষ্ট্যের করোটি
এই জীবাশ্মের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর গঠন। গবেষকেরা মুখমণ্ডল, চোয়াল ও দাঁতের গঠনে প্রাথমিক বা আধুনিক মানুষের সঙ্গে মিল পেয়েছেন। অথচ করোটি ও মস্তিষ্কগহ্বরের গঠন ছিল তুলনামূলক আদিম। অর্থাৎ মুখ ও দাঁত দেখতে আধুনিক, কিন্তু মস্তিষ্কের খুলি বড় হলেও অপেক্ষাকৃত প্রাচীন ধাঁচের। পরবর্তী কালের হোমো সেপিয়েন্সের তুলনায় এই করোটি ছিল লম্বাটে, আজকের মানুষের মতো গোলাকার নয়।
এর অর্থ হলো, আমাদের বর্তমান শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলো একসঙ্গে বা একটিমাত্র ধাপে গড়ে ওঠেনি। মুখের গড়ন আগে আধুনিক রূপ পেয়েছে, আর মস্তিষ্কের আকৃতির পরিবর্তন এসেছে ধীরে ধীরে, পরবর্তী হাজার হাজার বছরে।
বয়স কীভাবে নির্ধারিত হলো?
জীবাশ্মের বয়স নির্ধারণে একাধিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।
থার্মোলুমিনেসেন্স ডেটিং: ভাগ্যক্রমে সেখানকার অনেক চকমকি পাথরের সরঞ্জাম অতীতে আগুনে পুড়েছিল। গবেষক ড্যানিয়েল রিখটারের ভাষ্যে, এ কারণে ওই সরঞ্জামে থার্মোলুমিনেসেন্স পদ্ধতি প্রয়োগ করে নতুন জীবাশ্ম ও তার ওপরের স্তরগুলোর একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ কালপঞ্জি তৈরি করা গেছে।
ইলেকট্রন স্পিন রেজোন্যান্স (ESR): ১৯৬০ এর দশকে পাওয়া ইরহুদ-৩ চোয়ালের বয়স আগে বিশেষ ESR পদ্ধতিতে ১ লাখ ৬০ হাজার বছর ধরা হয়েছিল। গবেষকেরা এবার সেটি নতুন করে হিসাব করেন।
ফলাফল: প্রাপ্ত তথ্যমতে ফসিলের গড় বয়স দাঁড়ায় ৩ লাখ ১৫ হাজার ± ৩৪ হাজার বছর। ইরহুদ-৩ এর চোয়ালের একটি দাঁতের পুনরায় পরীক্ষিত ইউরেনিয়াম সিরিজ ও ESR বয়স ২ লাখ ৮৬ হাজার ± ৩২ হাজার বছর, যা নতুন বয়সকে সমর্থন করে। এই বয়স স্থানটির নিচের স্তরের আগের হিসাবের প্রায় দ্বিগুণ।
পাথরের সরঞ্জাম ও আগুনের ব্যবহার
একই স্তরে পাওয়া সরঞ্জাম থেকে সেই মানুষদের জীবনযাপন সম্পর্কে ধারণা মেলে। এখানকার বেশিরভাগ পাথরের যন্ত্র উন্নতমানের চকমকি পাথরে তৈরি, যা বাইরে থেকে আনা হয়েছিল। এই সরঞ্জামে লেভালোয়া (Levallois) কৌশলের ব্যবহার দেখা যায়। আর পুড়ে যাওয়া চকমকি পাথর থেকে বোঝা যায় যে সেখানে আগুনের ব্যবহার হতো। আগুন ব্যবহারের এই চিহ্নই আবার বয়স নির্ধারণের পথ খুলে দিয়েছে।
জাবাল ইরহুদের মতো মধ্য প্রস্তর যুগের সরঞ্জাম ওই সময়ে আফ্রিকার নানা জায়গায় পাওয়া যায়। এটি সম্ভবত এমন এক অভিযোজনের ইঙ্গিত দেয়, যা হোমো সেপিয়েন্সকে মহাদেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করেছিল। গবেষকদের মতে, আমাদের প্রজাতির উদ্ভব এবং মধ্য প্রস্তর যুগের সূচনা সময়ের দিক থেকে কাছাকাছি। এ থেকে মনে হয় দুটিরই উৎপত্তি সম্ভবত পুরো আফ্রিকাজুড়ে।
“পূর্ব আফ্রিকার ইডেন” নয়, গোটা আফ্রিকা
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য এখানেই। গবেষণাটি প্রমাণ করে যে মানুষের উৎপত্তি শুধু উত্তর আফ্রিকায় হয়নি। এটি ইঙ্গিত দেয় যে হোমো সেপিয়েন্স গোটা মহাদেশ জুড়ে বিবর্তিত হয়েছে। ঊবলাঁ নিজেও বলেছেন, যদি কোনো “এদন উদ্যান” থেকে থাকে, তবে তা সম্ভবত আফ্রিকা, আর সেটি অনেক বড় একটি উদ্যান। তাঁর মতে, ৩ লাখ বছর আগে আমাদের প্রজাতি, অর্থাৎ তার সবচেয়ে আদিম রূপ, আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, এটি জাবাল ইরহুদকে আফ্রিকার সবচেয়ে পুরোনো ও সবচেয়ে সমৃদ্ধ মধ্য প্রস্তর যুগের মানব-সংক্রান্ত স্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যেখানে হোমো সেপিয়েন্স হবার প্রাথমিক ধাপগুলো ধরা পড়েছে।
বিতর্ক ও সীমাবদ্ধতা
যদিও সব প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। কেউ কেউ মনে করেন, এই মানুষেরা হয়তো আমাদের সরাসরি পূর্বপুরুষ নয়, বরং প্রথম হোমো সেপিয়েন্সদের খুব কাছের আত্মীয় ছিল। আবার গবেষক দল জীবাশ্ম থেকে ডিএনএ নিতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। তাই জেনেটিক প্রমাণ দিয়ে এখনই বিষয়টি যাচাই করার সুযোগ নেই।
জাবাল ইরহুদের জীবাশ্ম দেখায় যে মানবজাতির উৎপত্তি কোনো একটি জায়গা বা একটি মুহূর্তের ঘটনা নয়। এটি আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে চলা দীর্ঘ, জটিল ও পরস্পর-সংযুক্ত একটি বিবর্তনীয় প্রক্রিয়া। মুখের আধুনিক গড়ন আর করোটির আদিম আকৃতির এই মিশ্রণই সেই ধীর রূপান্তরের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণগুলোর একটি।
