"দেবী-মিসির আলী প্রথমবার" মুভি রিভিউ
  • সিনেমেটোগ্রাফী
  • অভিনয়
  • কাহিনী
  • চরিত্র
3.9

দেবী-মিসির আলী প্রথমবার - যেরকম লেগেছে

মুভি দেখে হতাশ হবেন না। পাঠকের কল্পনার “দেবী” উপন্যাসের সাথে মিল খুঁজতে যাওয়াই বোকামী। উপন্যাসিক লিখেছেন তার মত করে, নির্মাতা বানিয়েছেন তার মত করে। দেবী হুমায়ূন আহমেদের প্রথম দিককার উপন্যাস, খুব সম্ভবত ১৯৮৫ তে প্রথম প্রকাশিত হয়। তখনকার লেখা আর পরের দিকের লেখায় অনেক তফাত থাকলেও, মিসির আলীর জন্য “দেবী” বিখ্যাত হয়ে আছে। দেবীর জন্য মিসির আলী নয়। কিন্তু পুরো মুভিতে মিসির আলীর প্রাধান্যই কম।

দেবী (2018) - মুভি রিভিউ 1

দেবী উপন্যাস আমি পড়েছি স্কুলে থাকাকালীন। আমার মনে তখনকার কল্পনা এবং আবেগই গেঁথে আছে। আমার স্পষ্ট মনে আছে পাবলিক লাইব্রেরীর সামনের ফুটপাথ থেকে আমি বইটা কিনেছিলাম ২০ টাকা বা তার কিছু কম দিয়ে। তখনকার সময়ে ২০ টাকার অনেক দাম ছিল। সময়টা মনে হয় ১৯৯৮ বা ১৯৯৯ সাল হবে।

মিসির আলির সাথেও আমার পরিচয় তখন থেকে। এই বইটা প্রথম যখন পড়ি আমার কখনই এটাকে ভৌতিক উপন্যাস মনে হয়নি। বরঞ্চ মনে হয়েছে একটা অমিমাংসিত রহস্যপোন্যাস। আমি তখন কাকাবাবুর ভক্ত, রহস্য রোমাঞ্চের উপর আমার অগাধ আগ্রহ। মনোবিদ্যা নিয়েও অল্পবিস্তর পড়াশোনা করি। নিজে ইন্ট্রোভার্ট হবার কারনে হিউম্যান সাইকোলজি আমার পছন্দের একটা বিষয় ছিল।

ভাবছেন একজন কিশোরের মনে এত কিছু থাকে কি করে? … থাকে রে ভাই, আপনার বন্ধু যখন বই হয়, তখন আপনার মানসিক বয়স এমনিতেই অনেক বেড়ে যায়। আমি আমার বয়সের থেকে আমি অনেক বেশি বুঝতাম এবং জানতাম।

এত কথা বলার একটাই কারন, মিসির আলী চরিত্রকে আমি কিভাবে বুঝি তাই ব্যাখ্যা করতে চাওয়া।

ফিরে আসি বর্তমানে ২০১৮ সালে।

দেবীর কাহিনী নিয়ে একটা মুভি হয়েছে স্বভাবতই হুমায়ূন ভক্তদের প্রত্যাশার সীমা নেই। থাকতেই পারে, অমর লেখকের অসাধারন এক সৃষ্টি। আমরা অধীর আগ্রহে ছিলাম কি থাকে চমক? পরিচালক কি তুলে আনতে পারবেন আমাদের কল্পনার মিসির আলী, রানু, নীলুকে?

নাহ… পারেননি। আশার পারদ ধপ করেই মাটিতে নেমে গেল মুভি দেখার পর।

এটাই স্বাভাবিক নয় কি?

প্রতিটা পাঠক বই পড়ার সময় আলদা আলাদা ভাবে প্রত্যেকটা চরিত্র আর ঘটনা কল্পনা করে। কারো পক্ষে সে কল্পনা সিনেমার পর্দায় তুলে নিয়ে আসাটা অসম্ভব একটা ব্যপার। যদি এই ছবিটা আপনার যথেষ্ট ভালো লাগাতে হয় তবে উপন্যসাটা আগে পড়া থাকলে হবে না 🙂

তারপরও কিছু কথা থেকে যায়। যখন এরকম কোন বিখ্যাত লেখকের নন্দিত কোন উপন্যস কে পর্দায় নিয়ে আসা হয় তখন অনেক সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। এর ছিঁটেফোটাও আমি মুভি দেখে খুঁজে পাইনি।

চঞ্চল চৌধুরী এবং জয়া আহসান অনেক শক্তিমান অভিনেতা, কিন্তু এই দুই জনকে মিসির আলী এবং রানু চরিত্রে বড়ই বেমানান লেগেছে।

মিসির আলীর হালকা পাতলা আর মোটা চশমার যে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমান মানুষটাকে আমরা খুঁজে বেড়াই তার সাথে এই জোকারি একদম যায় না। মিসির আলী রহস্য পছন্দ করেন, কারন তিনি জানেন যুক্তি দিয়ে এর ব্যাখ্যা করা যাবে তাই।

এই কারনেই আগে বলেছিলাম দেবী পড়ে আমার মনে হয়নি এটা ভৌতিক উপন্যাস, কিন্তু মুভি দেখে মনে হয়েছে “দেবী-মিসির আলী প্রথমবার” কে একটা ভৌতিক ছবি বানানোর অপচেষ্টা হয়েছে।

হুমায়ূন আহমেদ রহস্য পছন্দ করতেন এবং সেই সাথে তার মিসির আলী উপন্যাস গুলোতে সেগুলোর একটা ব্যখ্যাও দিতে চাইতেন। তিনি অনেক রহস্য সচেতন ভাবেই পাঠকের জন্য রেখে দিতেন।

তার ডুয়েল পার্সোনালিটির সৃষ্টি এই কারনেই মিসির আলী এবং হিমু। হুমায়ূন আহমেদের বই আমি যখনই পড়তাম তখনই বুঝতে পারতাম তিনি রহস্য বিশ্বাস করতে চান কিন্তু তার যুক্তিবাদী মন বারবার তাতে বাধা দেয়।

যারা দেবী উপন্যাসটা আগে পড়েছেন তারা নিশ্চই জানেন সেখানে কিরকম ভাবে বিশদ বর্ননা আছে ঘটনা পরিক্রমার। মাঝে মাঝে লেখকের তাড়াহুড়ো করে গল্প বলার প্রবনতাও লক্ষনীয়।

আফসোস আমাদের এই ছবিতে বইয়ের অনেক কিছুই নেই। ছবির গল্পের অনেকটাতেই মনে হয়েছে মিসির আলি চরিত্রের চঞ্চল জোকারি করছেন, অনুসন্ধান নয়।

আর সিরিয়াল কিলার চরিত্রে ইরেশ যাকেরকে কেমন যেন খাপছাড়া মনে হয়েছে। ফেইসবুক তখন ছিল না, কাজেই এর ব্যবহার মুভিতে নতুন এডিশন। মনে হয় এই প্রজন্মকে টার্গেট করে মুভি বানানোটাই লক্ষ্য ছিল। আফসোস…

হয়ত ছবির প্রয়োজনে অনেক অংশ পরিবর্তন করতে হয়েছে। অহেতুক ভৌতিক আবহ তৈরি করা আর পুরুষ কণ্ঠের ভৌতিক আহ্বান একদম ভালো লাগে নি। মূল উপন্যাস খুব তাড়াহুড়া করে শেষ করেছিলেন লেখক, কারন হয়ত রহস্য রাখতে চেয়েছিলেন তিনি। মুভি সেভাবে শেষ হয়নি।

তবে মুভির ব্যাকগ্রাউন্ডের পিয়ানোর শব্দ খুব ভালো লেগেছে। বাকি সাউন্ড ইফেক্ট নার্ভের উপর মারাত্বক 🙁

অনেক কিছুই না পাওয়া থেকে গেল এই ছবিতে। আমার গল্পের বইয়ের দেবীই ভালো। এই রকম রহস্যকে ভৌতিক আবহ দেবার বৃথা চেষ্টা করাটাই একটা ভুল ছিল।

নিজের থেকে অনেক কিছুই বলে ফেললাম, হুমায়ূন ভক্ত বলে কথা 🙂

লেখালেখিটা পেশা নয় বরং নেশা হিসেবে নিয়েছি। যা কিছু ভালো লাগে তাই লিখে যাই অনবরত। আমাদের আশে পাশে এত এত রহস্যের জাল ছড়িয়ে আছে, সেসব দেখতে দেখতে এক মানব জীবন কখন কেটে যাবে টেরই পাবো না!

মতামত দিনঃ