অভাজনের মহাভারত

মহাভারত এক বিশাল গল্পের বই। যার শুরু আছে কিন্তু শেষটা কেমন যেন তাড়াহুড়ায়, কেন যেন মনে হয় এই চরিত্রেরা অমর। কাজেই তাদের শেষ পরিনতি আসলে অন্য এক জগতের দিকে যাত্রা।

মহাভারতের গল্পে নানাজন নানা সময়ে তাদের নিজেদের গল্প জুড়ে দিয়েছেন, নিয়ে এসেছেন অলৌকিকতার আবহ। সেই ঘটনাক্রমে পড়ে পাঠকের মনে হতেই পারে তিনি দেব-দেবীর গল্প পড়ছেন। যুক্তি যেখানেই বাধা পেয়েছে সেখানেই নিয়ে এসেছেন দেবতার জাদুকরী সব উপাখ্যান।

মাহবুব লীলেনের “অভাজনের মহাভারত” সেই দুষ্টচক্র থেকে বের হয়ে আসার এক অসাধারন প্রয়াস। এই মহাগল্পের চরিত্রদের তিনি রুপ দিয়েছেন রক্ত মাংসের মানুষের। তাদের ক্ষুধা আছে, ঘৃনা আছে, হিংসা, কাম, স্বার্থপরতা আর নির্বুদ্ধিতাও আছে। আর আছে সাধারনের মত মৃত্যু।

ছোটবেলায় মহাভারত পড়েছিলাম, তার বেশিরভাগই মনে নেই অতিরিক্ত বিশেষনে এর চরিত্রদের বিশেষায়িত করার ফলে। এরপর নানা জায়গায় খন্ড খন্ড গল্প পড়েছি, কিন্তু কিছুতেই যেন পুরো গল্পটা একটা রুপ নিচ্ছিল না আমার পাঠক মনে।

সুবিশাল এই মহাভারতকে সাধারনের জন্য পাঠযোগ্য করে একটা রুপ দেবার এই অসাধারন চেষ্টাকে আমি তাই সাধুবাদ জানাই। বইয়ের শুরুতেই একটা বিশাল ভূমিকা দেয়া আছে, কিভাবে কোথা থেকে আজকের মহাভারত আসলো, এর মাঝখানে রামায়ান আর বেদ ঢোকানোর অপচেষ্টা, সব কিছুর একটা যৌক্তিক ব্যাখ্যা/ইতিহাস মাহবুব লীলেন দেয়ার চেষ্টা করেছেন। এই ভূমিকা না পড়লে বইটার আসল মর্মার্থ বোঝা দুষ্কর হবে।

মহাভারত মূলত রাজাদের গল্প, অসংখ্য অগুনিত তাদের সংখ্যা আর হরেক রকম তাদের চরিত্র। তাদের স্ত্রী-সন্তানের সংখ্যাও প্রচুর। যে কেউ খেই হারিয়ে ফেলতে পারেন। তবে এদের মাঝেও অনন্য হয়ে ওঠা পঞ্চপাণ্ডব, কুরু বংশ, কৃষ্ণ, দ্রৌপদী, কর্ণ, ঘটোৎকচ বা একলব্য, কুন্তী আর সর্বপৌরি কৃষ্ণ দ্বৈপায়নের যে মানবিক চরিত্র মাহবুব লীলেন তার এই বইয়ে তুলে ধরতে পেরেছেন তার জন্য লেখককে কত শত বিনিদ্র রজনী অধ্যায়ন করতে হয়েছে তা তিনিই ভালো বলতে পারবেন।

আপনার পরিশ্রম স্বার্থক হয়েছে, মহাভারতকে আপনি পাঠকের জন্য সুখপাঠ্য করতে সক্ষম হয়েছেন।

বইয়ের ভাষা নিয়ে অনেকের সমস্যা হতে পারে, কিন্তু লীলেনের গল্প বলার এই বৈঠকি ঢঙটাই আমার ভালো লেগেছে বেশি। যেন অনেক দিনের পরিচিত কোন বন্ধুর কাছে গল্প শুনছি।

বইটি সুখপাঠ্য এবং অবশ্যই আপনার সংগ্রহে রাখার মত।

প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫
ভাষাঃ বাংলা
ধরনঃ মহাকাব্য, ফিকশন
প্রকাশকঃ বাতিঘর