বিজ্ঞানীরা বেশ অনেক বছর ধরেই ক্যান্সার রোগ নির্নয়ের জন্য সহজ এবং কার্যকরী একটা পদ্ধতি খুঁজে বেড়াচ্ছেন। কারন বেশিরভাগ সময়েই দেখা যায় ক্যান্সার নির্নয় করতে করতেই রোগীর ক্যান্সার লাস্ট ফেইজে চলে যায় বা অবস্থা সংক্টাপন্ন হয়ে যায়। চিকিৎসকের তখন খুব বেশি কিছু করার থাকে না। অনেকে আবার বুঝতেই পারেন না তাদের ক্যান্সার হয়েছে।

আশার বিষয় শুনিয়েছেন এবার বিজ্ঞানীরা। শুধুমাত্র রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই জানা যেতে পারে পেট, খাদ্যনালী, কোলোরেক্টাল, ফুসফুস এবং যকৃতের ক্যান্সারের পূর্বাভাস। তাও যদি আবার বছর চারেক আগে জানা যেতে পারে তবে ক্যান্সারকে আর দশটা সাধারন রোগের মতই নির্মূল করা যাবে। মৃত্যুহার কমে আসবে আরো অনেক নিচে।

ন্যাচার জার্নালের এক আর্টিকেলে তারা জানিয়েছেন, ক্যান্সারের কোন লক্ষন প্রকাশ পাবার আগেই এই পদ্ধতিতে ক্যান্সার হবার কথা আগাম বলে দেয়া যাবে। আন্তর্জাতিক গবেষকদের এই দল যেই গ্রুপের উপরে পরীক্ষা চালিয়েছেন তাদের সকলের ফলাফলই পজিটিভ ছিল। তারা যাদের ক্যান্সার হবে বলে ধরে নিয়েছিলেন তাদের সবাই পরে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ডিয়াগোর একজন বায়োইঞ্জিনিয়ার কুন ঝাং, তিনি বলেন “আমাদের এই গবেষনা প্রমান করেছে শুধুমাত্র রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই ক্যান্সার নিয়ে হসপিটালে আসার ৪ বছর আগেই আমরা সম্ভাব্য রোগীর ক্যান্সার নির্নয় করতে পারব।”

রক্তে পরীক্ষায় ক্যান্সার নির্নয়ের জন্য গবেষকরা ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যাক্তির রক্তের নমুনা সংগ্রহ করতেন। তারপর এর টিস্যু, ডিএনএ এর রাসায়নিক পরিবর্তন এবং নির্দিষ্ট প্রোটিনের উপস্তিতি সনাক্ত করার চেষ্টা করতেন। মোটামুটিভাবে তারা এটাই দেখতে চাইতেন সকল ক্যান্সার রোগীর রক্তে একই ধরনের কি কি রাসায়নিক উপাদান বা পরিবর্তন হয়ে থাকে।

রক্ত পরীক্ষায় ৪ বছর আগেই জানা যেতে পারে ক্যান্সার এর পূর্বাভাস! 1

কুন ঝাং এটাও বলেন “আপনি কখনই প্রমান করতে পারবে না আপনার পদ্ধতি প্রচলি ক্যান্সার নির্নয়ের পদ্ধতির থেকে বেশি কার্যকর। বরঞ্চ আমরা চেয়েছি এমন একটা পদ্ধতি আবিষ্কার করতে যা প্রচলিত রক্তপরীক্ষার মতই সমানভাবে কার্যকর। আমরা শুধুমাত্র বছরকয়েক আগে ফলাফল দিতে পারি।”

তাইজহু, চায়নাতে বার্ষিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য আসা ১২৩,০০০ লোকের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেন কুন ঝাং এবং তার দল। সংখ্যাটা কিন্তু নমুনা সংগ্রহের জন্য অনেক বড়। এই নমুনা আবার যত্ন করে সংরক্ষনের জন্য তাদের আলা্দা ওয়্যারহাউস নির্মান করতে হয়েছিল। সেটা ২০০৭ সালের কথা। এরপর গত দশ বছরে এই গ্রুপের প্রায় ১০০০ লোক ক্যান্সের আক্রান্ত হয়। এদের রক্তের ডাটা বিশ্লেষনেই মূলত ঝাং এবং তার দল বুঝতে পারেন ক্যান্সার হবার আগেই রক্ত কিভাবে তার উপাদান পরিবর্তন করে সংকেত দেয়।

এই গবেষক দল পাঁচটি পরিচিত ক্যান্সার নির্নয়ের একটা পদ্ধতি আবিষ্কারের চেষ্টায় ছিলেন। পেট, খাদ্যনালী, কলোরেক্টাল, ফুস্ফুস এবং যকৃতের ক্যান্সার নির্নয় করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল। তারা যে পদ্ধতিটি তৈরি করেছেন তার নাম PanSeer। এই পদ্ধতিতে ডিএনএ এর মিথাইলেশন (methylation patterns) প্যাটার্নগুলি সনাক্ত করে। এখানে DNA এর সাথে একটা ক্যামিকেল গ্রুপ যোগ করে দেয়া হয় এবং তার ফলে কি কি পরিবর্তন ঘটে তা দেখা হয়। গবেষনায় আগেও দেখা গেছে DNA এর সাথে বিশেষ কিছু রাসায়নিক গ্রুপ যোগ করা হলে তা ক্যান্সারের উপসর্গ বলে দেয়। অন্ত্র এবং কোলন ক্যান্সার নির্নয়ে এই পদ্ধতি বেশ কাজে আসে।

PanSeer টেস্ট এ রক্ত থেকে DNA আলাদা করা হয়, এরপর DNA এর ৫০০ জায়গায় মিথাইলেশন এর প্যাটার্নগুলো সনাক্ত করা হয়। এই ডাটা একটা মেশিন লার্নিং এলগরিদম দিয়ে যাছাই-বাছাই করে একটা স্কোর দেয়া হয়। এই স্কোরই বলে দেয় আপনার ক্যান্সার হবে কিনা। ১৯১ জন অংশগ্রহনকারীর রক্তের নমুনা পরীক্ষা করেছিলে গবেষক দল। এরা শেষ পর্যন্ত ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। একইভাবে স্বাভাবিক মানুষের রক্তের স্যাম্পল নিয়েও এই পরীক্ষা করা হয়েছিল।

দেখা গেছে এই পরীক্ষা ৯০ শতাংশ সঠিকভাবে ফলাফল দিতে পারে, আর ৫ শতাংশ ভুল।

ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটন স্কুল অফ মেডিসিনের মলিকিউলার রোগ বিশেষজ্ঞ কলিন প্রিকার্ড বলেছেন, “রক্ত-প্লাজমা ভিত্তিক ক্যান্সার-স্ক্রিনিং এর এই টেস্ট নতুন একটা স্বম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে। তিনি সরাসরি এই গবেষনার সাথে জড়িত না থাকলেও মনে করেন ঝাং এবং তার দলের এই ফলাফল আরো গবেষক দল দিয়ে যাচাই করে দেখতে হবে। যদি সেখানেও একই রকম ফলাফল পাওয়া যায় তবেই আমরা ক্লিনিকাল টেস্ট হিসেবে এটাকে ব্যবহার করতে পারব।

কুন ঝাং নিজেও মনে করেন এখনো আরো গবেষনা করার দরকার আছে। শতভাগ নির্ভরযোগ্য হবার আগে কোনভাবেই এটাকে ক্যান্সার নির্নয়ের একমাত্র রক্ত পরীক্ষা বলা যাবে না। বরঞ্চ এমন হতে পারে এটাকে প্রাথমিক রক্ত পরীক্ষা বলা যেতে পারে। এই পরীক্ষায় কেউ পজিটিভ হলে তারপর প্রচলিত বাকি পরীক্ষাগুলো করা যাবে শতভাগ নিশ্চিত হবার জন্য।

তবে আমরা আশা করতেই পারি, সেদিন বেশি দূরে নয় যখন অনেক আগে থেকেই আমরা জেনে যাব ক্যান্সার হবে কি হবে না। এবং বদলে দিতে পারব জীবন আর চিকিৎসার গতিপথ।

মতামত দিনঃ