হাতি দিয়ে লেখা শুরু করতে চাইনি। কিন্তু শুরু করা হয়ে গেল। এই তো মাত্র কয়েকদিন আগের ঘটনা। ভারতের কেরালায় একটা গর্ভবতী হাতিকে বিস্ফোরক ভর্তি আনারস খেতে দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। হাতিটার কোন দোষ ছিল না…। অথবা, একটা অপরাধ সে করেছিল, মানুষকে বিশ্বাস করে।

যে এলাকার মানুষ এই নির্মম বর্বরতা ঘটিয়েছে সেখানকার শিক্ষার হার নাকি ৯৪% । কি মর্মান্তিক বিষয় আমাদের জন্য। আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি এদের শিক্ষা কার্যক্রমে জীবে প্রেম বিষয়টা অন্তর্ভুক্ত ছিল না। সহানুভুতি, মায়া, মমতা, পরিবেশের প্রতি জীব হিসেবে দায়িত্ব এগুলো আসলে আমাদের পাঠ্যক্রমে কখনই ছিল না।

আচ্ছা, পাশের দেশের এই নির্মম আচরনে আমাদের খারাপ লাগার কারন কি? সোশ্যাল মিডিয়া ফ্লুক?

আপনি জানেন কি, উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প বানানোর জন্য প্রায় ৬৪টি এশিয়ান হাতির আবাসস্থল ধ্বংস করা হয়েছিল। এটাও তো এক ধরনের খুন। এরপর খাবারের খোঁজে এরা যখন ঘুরে বেড়াবে তাদের আদি আবাসস্থলে, এই মানুষেরাই এদের পুড়িয়ে মারবে।

প্রকৃতি মনে রাখবে, মানুষ নামের অমানুষেরা তাদের দায়িত্ব পালন করেনি। প্রকৃতি মনে রাখে, কিছুই ভুলে যায় না। আর সে কড়ায় গন্ডায় সব ফিরিয়ে দেবে।

একটা কথা আমি বারবার বলি, প্রকৃতি কখনো ব্যক্তি বিশেষের উপর প্রতিশোধ নেয় না, সে প্রতিশোধ নেয় প্রজাতির উপর।

মানুষ নামের এই দোপেয়ে জীবেরা মাটি, সমুদ্র, আকাশ সব কিছু দূষিত করে দিয়েছে। তার একার আরাম আয়েসে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে কত হাজারো প্রজাতি। সারভাইবাল অব দ্যা ফিটেস্ট এর রেইসে টিকে গেছি আমরা। কিন্তু এই টিকে থাকতে গিয়ে বিনা প্রয়োজনে আমরা নির্বিচারে নষ্ট করে গেছি অন্য জীবের আবাসস্থল। প্রকৃতি মাতা কি প্রতিশোধ নেব না? আলবৎ নেবে।

পৃথিবীর সব থেকে বড় বনাঞ্চল আমাজন, মানুষের থাবা সেখানেও পড়েছে। মাইলের পর মাইল পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে পরিকল্পনা মাফিক। কত লাখ লাখ জীব-জন্তুর আবাস চলে গেছে মানুষের করাল থাবায়।

পরিবেশ অভিশাপ দেয় না, যেটা করে সেটা হচ্ছে প্রতিশোধের পরিকল্পনা।

ইউরোপীয়রা আসার আগ পর্যন্ত আমেরিকার তৃনভুমিগুলো অগুনিত বাইসন চরে বেড়াত। আদিবাসী রেড-ইন্ডিয়ান আর মাংসাশী প্রানিরা এদের উপর নির্ভর করলেও তা একটা সাম্যাবস্থায় ছিল। যখন ইউরোপীয়ানরা বসতি স্থাপন করা শুরু করল, তারা মাংসের চাহিদার জন্য নজর দিল এই বাইসনদের উপর। শুরু হল নির্বিচারে বাইসন নিধন।

মাত্র চল্লিশ কি পঞ্চাশ বছরের মধ্যে আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানরাও যেমন কোনঠাসা হয়ে পড়ল, তেমনি মারাত্বক ভাবে অস্তিত্ব সংকটে পড়ে গেল বাইসনেরা। মানুষ নামক এই দোপেয়ে জীবের কাজ। প্রকৃতি ভুলে যায় না।

তাই প্রতিবছর যখন পঙ্গপালের আক্রমনের তীব্রতা বাড়ে, তখন মনে হয় একটু একটু করে প্রকৃতি মাতা তার পাখিদের হত্যা করার প্রতিশোধ নিচ্ছে। সে মিছিলে যুক্ত হবে আরো নিত্য নতুন রোগ বালাই। কখনো এইডস, কখনো করোনা বা কখনো সরাসরি ভুমিকম্প আর ঘুর্নিঝড় নামে।

একটা হাতির প্রতি নির্মমতায় তাই আবেগে কেঁপে ওঠার আগে ভাবুন আমরা মৃত্যুর মিছিলে যোগ করেছি হাতি, সিংহ, বাঘ, চিতা, হরিন, পাখি, তিমি এবং অগনিত প্রজাতি। কি… নিজেকে সবথেকে বুদ্ধিমান বলতে এখনও লজ্জা হয় না?

ভবিষ্যত দেখতে পান না? হাজারবার সাবধান করা হয়েছে আপনাকে বৈশ্বিক উষ্ণতা আর বৃক্ষ নিধন সম্পর্কে। সমষ্টিগত ভাবে কি করেছি আমরা? কিছুই না। লাভের নামে বারোটা বাজিয়েছি আরো হাজারো প্রজাতির।

এই ইকোসিস্টেমে প্রতিটা প্রজাতির সমান অধিকার আছে বেঁচে থাকার। সাম্যাবস্থা বজায় রাখার জন্য হলেও মানব প্রজাতির সংখ্যা নিয়ন্ত্রন করার চেষ্টা করবে প্রকৃতি। আপনি আমি তৈরিতো সেই রোষানল দেখার জন্য?

একটা হাতির জন্য মায়াকান্না না কেঁদে তাই ভবিষ্যতের কথা ভাবুন। প্রজাতি হিসেবে আমরা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

লেখালেখিটা পেশা নয় বরং নেশা হিসেবে নিয়েছি। যা কিছু ভালো লাগে তাই লিখে যাই অনবরত। আমাদের আশে পাশে এত এত রহস্যের জাল ছড়িয়ে আছে, সেসব দেখতে দেখতে এক মানব জীবন কখন কেটে যাবে টেরই পাবো না!

মতামত দিনঃ