পাড়ার ছাব্বির ভাইয়া, ছোট ভাইয়া আর আমি এই তিনজনকে সবসময়ই একসাথে দেখা যায়। যদিও ওরা আমার চেয়ে সাত-আট বছরের বড়। ফুটবল খেলা থেকে শুরু করে ঘোরাফেরা কিছুই ওরা আমাকে ছাড়া করে না। একদিন ওরা বুদ্ধি করল প্রতিবেশী আইয়ুব মিয়ার বাগানে ঢুকবে। হাফ প্রাচীরটা টপকে পা টিপে টিপে আমরা বাগানের ভেতর দিয়ে এগোচ্ছি।

আমিঃ আমরা কী করতে যাচ্ছি?
ছাব্বির ভাইয়াঃ জাম পাড়তে যাচ্ছি।
আমিঃ বাসায়ই তো এক ঝুড়ি জাম আছে।
ছোট ভাইয়াঃ থাকুক।
ছাব্বির ভাইয়াঃ উফফ! এতো কথা বলিস না তো। চুপ কর, মুখে আঙ্গুল দে।

আর প্রশ্ন করা বাদ দিয়ে মুখে আঙুল দিয়ে আমি ওদের সাথে এগোচ্ছি। জাম গাছের কাছে পৌঁছে ওরা দুজন গুলতি দিয়ে জাম গাছে ঢিল ছুঁড়ল। একটা ঢিল সোজা যেয়ে লাগল গাছের মৌমাছির চাকে। ব্যাস, ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি উড়ে আসতে শুরু করল। সাথে সাথে আমি গলা ফাটিয়ে চিৎকার শুরু করে দিলাম। আমার চিৎকার শুনে বাগানে কে দেখার জন্য বুড়ো আইয়ুব দাদা সাথে সাথে দৌড়ে আসলেন। এই দেখে ওরা আমার মুখ চেপে ধরে আমাকে কোলে তুলে দে দৌড়। ধরতে না পারলেও দাদা পেছন থেকে আমাদের দেখে চিনে ফেললেন। কিন্তু মৌমাছিগুলো তাকে সামনে পেয়ে তার গায়েই হুল ফুটিয়ে দিল। আর তিনি বাবা গো, মাগো, দিলো রে, বিচ্ছুর দল, দাঁড়া তোদের দেখাচ্ছি মজা বলে চিৎকার জুড়ে দিলেন। তারচেয়েও ভয়ানক ঘটনাটা হল ঊনি সন্ধ্যাবেলা এসে আব্বার কাছে বিচার দিয়ে গেলেন।

আমাদের আব্বাজান খুব হাসিখুশি আর আমোদ প্রিয় একজন মানুষ। ছুটির দিন মানেই বাড়িতে পোলাও-কোরমা রান্না হবে আর ভেতর উঠোনে গাছের ছায়ায় ঘাসের ওপর পাটি বিছিয়ে হারমোনিয়ামটা নামিয়ে আমাদের সব ভাই-বোনকে গোল করে নিয়ে বসে শুরু হয়ে যাবে আব্বার সংগীতচর্চা। সংগীতচর্চা মানে একটাই গান দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে প্রাণপণে গেয়ে যাওয়া- “বাগীচায় বুলবুলি তুই ফুল শাখাতে দিন নে আজি দোল…”। সবার ধারণা তার এই ভয়ানক সংগীতচর্চা শুনে শুধু বাগীচার বুলবুলি কেন স্বয়ং নজরুল ইসলাম থাকলে তিনি পর্যন্ত নিশ্চিত আঁতকে উঠে দৌড়ে পালাতেন। কিন্তু আমাদের কান ঝালাপালা হয়ে গেলেও পালানোর কোনো উপায় নেই। তবে রান্নার ফাঁকে ফাঁকে কখনো আম্মা এসে সুমধুর কণ্ঠে একটা-দুটো গান শুনিয়ে যায়। তখন আমাদের কানগুলো কিঞ্চিৎ আরাম পায়।

আব্বা সবসময় খুব হাসিখুশি মানুষ হলেও তার কথার বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা আমাদের কারোরই নেই। আমাদের জন্য সর্বদাই চার-পাঁচটা কাঁচা কঞ্চি মাঠিয়ে সেগুলো সরিষার তেল মালিশ করে রাখা হয়। ছোট থেকে বড় সবাইকেই রোজ সকাল-সন্ধ্যা নিয়ম করে যার যার পড়ার টেবিলে পড়তে বসতে হয়। আব্বা যখন যাকে বইয়ের যেখান থেকে ইচ্ছে হুট করে এসে প্রশ্ন করে। আর পড়া না পারলেই ব্যাস, শুরু হয়ে যায় উত্তম-মধ্যম।

আব্বা বলে তাদের সময়ে দাদাজান পড়ালেখার জন্য তাদেরকে শহরে লজিং-এ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। অন্যের বাড়িতে টিনের ছাপড়ায় থাকতে হতো; বৃষ্টি-বাদলে কখনো চাল ফুটো হয়ে টপটপ করে পানি পড়তো। ইচ্ছে হলেও বাড়ি যেতে পারতেন না। পড়ালেখা করার জন্য তাদের জীবনে কতো ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। আর সেখানে এতো সুযোগ-সুবিধা পেয়ে, এতো সুখে থেকেও কেন আমাদের একটা চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত ভুল হবে?

আব্বার আরও হুকুম হল সন্ধ্যার পর কেউ কোনো অবস্থাতেই বাড়ির বাইরে থাকতে পারবে না। মাগরিবের আজানের আগে সবাইকে বাড়িতে ঢুকতে হবে। নইলে খবরই আছে। রাতের খাবার রাত আটটার মধ্যেই খেয়ে ফেলতে হবে। এই সময়ের ভেতর না খেলে আব্বা আর কোনোভাবেই তার খাওয়ার বিল পাস করে না। সেই রাতের জন্য তাকে অভুক্তই থাকতে হয়। আব্বার এরূপ বহুবিধ কঠোর নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে মানুষ হয়েও তার সুপুত্রের নামে পাড়ার মুরুব্বি এসে নালিশ করে যাবে এটা তো কিছুতেই মানা যায় না।

আব্বা এতো রেগে গেল যে মতিকে (কাজের ছেলে) বাজারে পাঠিয়ে দশ কেজি জাম কিনে আনালো আর আব্বার চোখের সামনে বসে ছোট ভাইয়াকে সেগুলো খেয়ে শেষ করতে বলল। এতোগুলো জাম খেতে না পারায় শেষে পাঁচ পাঁচটা কাঁচা কঞ্চিই ভাইয়ার পিঠের ওপর ভাঙা হল। সাথে আমার বরাতেও কিছু জুটলো। কিন্তু আব্বার মার যতোটা না লাগল তারচেয়ে বেশি লাগল যখন এতো বেধড়ক মার খেয়েও একটু পর সুযোগ বুঝে ছোট ভাইয়া এসে আমার পিঠের ওপর ধুম ধাম কয়েকটা বসিয়ে দিয়ে কান টেনে ধরে বলল, “মৌমাছি কি রাক্ষস? তোকে কি গিলে খেয়ে ফেলতো নাকি? আর জীবনে যদি তোকে কোথাও নিয়ে যাই…”। আমার এবার দুশ্চিন্তা শুরু হয়ে গেল যে ও যদি সত্যি আমাকে আর কোথাও ওর সাথে না নিয়ে যায় তাহলে বারভাজা-চানাচুর-মটরভাজা-বাদাম-আচার-চটপটি-হাওয়াইমিঠাই-সন্দেশ এইসব রাজ্যের লোভনীয় খাবারগুলো আমার তো আর খাওয়াই হবে না কখনো।

এদিকে আব্বা শুধু ভাইয়াকে শাস্তি দিয়েই ক্ষ্যান্ত হল না, ছাব্বির ভাইয়ার আব্বার কাছেও গেল সবকিছু জানাতে। আর ছাব্বির ভাইয়ার আব্বাও তাকে ছেড়ে দিল না। যেহেতু মৌমাছি দেখে চিৎকার দেওয়ার অকাণ্ডটা আমিই ঘটিয়েছিলাম তাই অপর দুজনের সব রাগ আমার ওপর এসে পড়বে এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু পরদিন স্কুল থেকে ফিরে দুজনই খুব হাসিমুখে আমার কাছে এল। ছাব্বির ভাইয়া পকেট থেকে রুমালে মোড়ানো একটা খোরমা বের করে আমার সামনে ধরল। আমি খোরমা এতো পছন্দ করি যে ছোট ভাইয়ার স্কুলে যেদিনই খোরমা টিফিন দেয় ও সেটা না খেয়ে আমার জন্য নিয়ে আসে। আজও আমি খোরমাটা নিতে গেলাম কিন্তু ছাব্বির ভাইয়া হাত সরিয়ে নিয়ে বলল, “উঁহু, এটা খেতে চাইলে আমাদের হাত থেকেই খেতে হবে”। আর রুমাল থেকে খোরমার একটা অংশ বের করে আমার মুখের সামনে ধরল। কামড় দেওয়ার পর আমি বুঝলাম ওটা খোরমা না, খোরমার মতো দেখতে একটা পাথর। আর পাথরে কামড় দেওয়ায় আমার নড়বড়ে দাঁতটা উঠে যেয়ে মুখ থেকে দরদর করে রক্ত বের হতে শুরু করল। একে তো আগের দিন এতো বড় একটা অকাণ্ড ঘটিয়েছে, তার উপরন্তু আজ আবার আমার মুখ থেকে রক্ত পড়তে দেখে ওরা আরো ভয় পেয়ে কেন রক্ত পড়ছে সেটা না বুঝেই সেখান থেকে জান নিয়ে পালিয়ে গেল। দুপুরে ভাত খেতেও আর ফেরেনি দুজন। শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যা হতে চলল তবু ওদের বাড়ি ফেরার কোনো নামগন্ধ নেই। বড় ভাইয়া ওদের খুঁজতে বের হল কিন্তু পাড়ার ত্রিসীমানার মধ্যে ওদের খুঁজে পাওয়া গেল না। এরপর আব্বাও খুঁজতে বের হল।

আমার মাড়ি থেকে রক্ত পড়া, ব্যাথা সব কখনই সেরে গেছে। কিন্তু ওদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না দেখে ওদের জন্য কান্না পেতে শুরু করেছে। মনেহচ্ছে ওদের যদি আর খুঁজে পাওয়া না যায় তখন কী হবে? ওরা তো কিছু খায়ওনি। নিশ্চই ওদের অনেক ক্ষিদে পেয়েছে। কোথায় যে আছে? নাকি ওদের ছেলেধরাই ধরে নিয়ে গেল? এবার আমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলাম। শেষমেশ রাত আটটার দিকে বড় ভাইয়া কোত্থেকে যেন ওদের খুঁজে নিয়ে এল। আমি দৌড়ে ঘর থেকে ছুটে এসে ছোট ভাইয়াকে দেখেই একটা হাসি দিলাম। কিন্তু ও আড়চোখে একবার আমার দিকে তাকিয়ে আমার ফোকলা মুখ দেখে বুঝে গেল যে আমার নড়বড়ে দাঁতটা পড়ে গেছে, আর কিছুই না। আমার ওপর আর নিজের বোকামিতে ওর মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেল।

আব্বা বাড়ি এসে ছোট ভাইয়াকে দেখেই অগ্নিমূর্তি ধারণ করল। কাঁচা কঞ্চিগুলো তো সব আগের দিনই ভেঙে গেছে। কঞ্চি সরবরাহকারী নিতাই কাকাকে সকালে অর্ডার দেওয়ার পর কঞ্চি এখনো এ বাড়িতে এসে পৌঁছয়নি। তাই আব্বা হাত দিয়েই পেটাতে শুরু করে দিল। তারপর সকালের মধ্যে ওকে বিজ্ঞান বইয়ের পাঁচটা অধ্যায় পড়া দেওয়ার হুকুম দিয়ে চলে গেল।

বলাইবাহুল্য এ সবকিছুর সুবাদে পরবর্তি কিছুদিনের জন্য কোল্ডড্রিংস-এর বোতল থেকে শুরু করে চুপ চুপ করে আইসক্রিম খাওয়া এমন বহু আকর্ষণীয় জিনিসে ও আমাকে ভাগ দেওয়া থেকে বঞ্চিত করল, এমনকি কথা বলাও বন্ধ করে দিল। যখন কোনোভাবেই কোনোকিছু ঠিক হচ্ছে না তখন একদিন সক্কালবেলা ঘুম থেকে উঠে আমি স্কুল না যেয়ে জেদ করে বিছানা-বালিশ-তোষক সব উল্টেপাল্টে উঁচু পাহাড় বানিয়ে তার ওপর উঠে বসে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে দিলাম। আব্বা বাজার থেকে এসে আমাকে কাঁদতে দেখে প্রশ্ন করল, “এই ওকে কে কাঁদিয়েছে?” কিন্তু কেউ আর আমার কান্নার রহস্য উদঘাটন করতে পারছে না।

এদিকে যার বোঝার সে তো ঠিকই বুঝে গেল যে আমি কেন কাঁদছি কিন্তু সে কোনো তোয়াক্কাই করছে না। নিজের কাজ নিয়েই সে ব্যস্ত। এতে আমার কান্নার তীব্রতা আরো বেড়ে গেল। আব্বা পাড়ার মোড়ের দাদুর দোকান থেকে প্রতিদিনের চেয়ে দশগুণ বেশি চকোলেট কিনে এনে আমাকে দিল যেন আমার কান্না থামে। কিন্তু কিছুতেই আমার কান্না তো থামছে না। কারণ যার বোঝার সে কোনো দয়াই দেখাচ্ছে না আমার ওপর।

আম্মা জিগেস করছে, “কি পেটে ব্যাথা? দাঁতে ব্যাথা?” এসব কিছুই না এটা জেনে শেষে সবাই আমাকে আমার হালে ছেড়ে দিয়ে চলে গেল যে আমি কতক্ষণ কাঁদতে পারছি কাঁদি, তারপর নিজেই একসময় চুপ হয়ে যাব। সাড়ে তিন ঘন্টা এভাবে একটানা কাঁদার পর ছোট ভাইয়া স্কুল যাওয়ার আগে এসে বলল, “হইছে আর কাঁদতে হবে না। তোকে মাফ করে দিলাম। কিন্তু আর কোনো গণ্ডগোল করবি না, বুঝলি?” আমি চোখ মুছতে মুছতে মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম, “করব না।“ ভাইয়া চকোলেটগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, “আর এগুলোতে কিন্তু আমারও ভাগ আছে। সারাদিন বসে বসে সবগুলো খেয়ে শেষ করে ফেলবি না।“ আমি আবার মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর দিলাম, “আচ্ছা।“ ভাইয়া এবার হাসতে হাসতে বলল, “বিকেলবেলা রেডি হয়ে থাকবি। নতুন ঘুড়ি বানিয়েছি। নদীর ধারের মাঠটায় ওড়াতে যাব। ছাব্বিরের জ্বর এসেছে। কান্নাকাটি না করলেও তো তোকে আজ নিয়ে যেতাম। একা একা ঘুড়ি ওড়াতে কি আর ভালো লাগে?”  


লেখিকাঃ বাংলাদেশের শেষ প্রান্তের বিখ্যাত এক জেলা ঠাকুরগাঁয়ে তার জন্ম। শৈশব থেকেই কবি নন, তবে জীবন তাকে উপহার দিয়েছে অনেক কবিতা। জীবনের প্রয়োজনে প্রিয় স্বদেশ আর শৈশবের টাঙ্গন থেকে দূরে আছেন এই কবি।

নিপা খান এ প্রজন্মের কবি। শব্দের বেড়াজালে বেঁধে নিয়েছেন প্রতিবাদ আর প্রতিশ্রুতির হাতিয়ার গুলোকে। “বুনো মেঘ” “অর্ধেক দেবদারু” তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ।

মতামত দিনঃ