আজো পল্লবীর জীবনের অনেকখানি জুড়ে আছে ওর নাম। ওর সাথে দেখা হয়েছিল শরতের কোন এক সকাল বেলায়। তখন রেজাউল স্যারের কোচিং এ প্রতি সকালে পড়তে যেত পল্লবী। স্যারের আসায় প্রায়ই দেরী হত। ঐ সময় বান্ধবীরা যখন ধরাবাঁধা গল্প নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ত,পল্লবী তখন ছুটে যেতো নিরিবিলি পথ ধরে।

পথের দু’ধারে ক্ষেত। ক্ষেত ভরা বর্ষাকালের যাই যাই করা পানি। তার মাঝে সকালবেলা ফুটে থাকত হাজারো শাপলা ফুল।পল্লবী ক্ষেতের ধারের নরম মাটিতে পায়ের আঙুলের উপর শরীরের ভর রেখে সহজেই ছুঁতে পারতো শাপলা ফুল। এমনি করে সে হালকাভাবে ছুঁয়ে দিচ্ছিলএকটি সদ্য ফোঁটা শাপলা ফুল।

হঠাৎ মুখে কাদা, পানির ছিটা লাগায় মুখ তুলে তাকালো সে।দেখে একটি ছেলে সদ্য ছেঁড়া শাপলা হাতে দাড়িয়ে আছে তার সামনে। বললো “নাও।”

“কেন, আমি তোমার ফুল নিতে যাব কেন?”

ছেলেটি বললো “তুমিতো ফুল তুলতে চাচ্ছিলে,পারছিলে না, তাই আমি তুলে দিলাম,নাও ফুল নাও।”

ছেলেটির বাড়ানো হাতের দিকে তাকিয়ে পল্লবী বললো”আমিতো ফুল ছুঁয়ে দিচ্ছিলাম। ফুল ছুঁতে আমার ভাল লাগে তাই ।তুমি কেন আগ বাড়িয়ে ফুল ছিঁড়তে গেলে? ফুল ছেড়া আমার ভাল লাগে না!”

ছেলেটিকে হতবিহ্বল করে দিয়ে পল্লবী চলে যায় সামনের দিকে।খানিক পরে যখন কোচিং রুমে ফিরে আসে তখন ছেলেটির সাথে আবার দেখা হয়। স্যার পরিচয় করিয়ে দেন “ও সাদমান,এখন থেকে তোমাদের সাথে পড়বে।” এরপর কথা হয় সাদমানের সাথে। পরিচয়ের প্রাথমিক পর্ব পার হলে রফা হয় আর কখনো ফুল ছিঁড়তে পারবে না সাদমান।

এরপর থেকে ওরা দুজনে পথে পথে ফুল দেখে বেড়াতো। যখন দেখতো গ্রামের ছেলেমেয়েরা আটি বেধে শাপলা তুলে নিয়ে যাচ্ছে, তখন ওরা ব্যথাভরা চোখে আরেক দিকে তাকিয়ে থাকতো। এরপর ক্ষেত শুকিয়ে গেলে,শাপলারা যখন সব উধাও হয়,তখন ওরা অন্য ফুলের কাছে যায়। দুজনে ফুলের পাশে দাঁড়িয়ে বুক ভরে শ্বাস নেয়। বেঁচে থাকার শ্বাস।

এরপর পল্লবীর বাবা বদলী হয়ে সবাইকে নিয়ে চলে আসেন শহরে।সাদমানের সাথে পল্লবীর সম্পর্কটা ওখানেই থমকে যায়।

আজ পল্লবী যখন তার তিন বছরের মেয়ে নিলীমাকে নিয়ে ঢাকায় যাওয়ার জন্য স্টেশনে বসে ছিল তখন হঠাৎ করেই একটা লোক তার পাশে এসে বসলো। হঠাৎ আসা বৃষ্টিতে লোকটা কাক ভেজা হয়ে গেছে।তবে তার হাতে আছে সুন্দর এক গোছা রজনীগন্ধা ফুল। পল্লবী খেয়াল করলো লোকটা বসার পর থেকেই ফুলগুলোর উপর আনমনে হাত বুলিয়ে যাচ্ছে। লোকটার মুখের দিকে তাকাতেই চমকে উঠল সে। মনের অজান্তেই চোখ পেরিয়ে বেড়িয়ে এল দু’ফোটা জল। ধীর পায়ে সে লোকটার পাশে গিয়ে বসলো। লোকটা যখন ইতস্ততভাবে বেঞ্চের পাশের দিকে সরে যাচ্ছিল তখন আচমকা ফুলগুলোর উপর হাত রাখলো পল্লবী। প্রশ্নভরা,অর্থপূর্ণ চোখে তাকালো সাদমানের দিকে। অতীত সাথে নিয়ে ঘোরা সাদমানের ঘোর কাটেনি তখনো।


ফুল ছোঁয়া - 1

মিজান শেখ, জন্ম বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার ভাংগা থানার অন্তর্গত চুমুরদী গ্রামে। পড়ালেখা করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগে।

মতামত দিনঃ