কক্ষপথ 1

সকাল থেকেই অস্থির হয়ে রুম খুঁজছে শ্রেয়া । বিকেলের মধ্যেই ওকে একটা থাকার মতো জায়গা খুঁজে বের করতে হবে ।

সারাদিন বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজির পর বিকেলের দিকে যেও একটা রুম পাওয়া গেল কিন্তু বিপত্তি হল রুমটায় কোনো জানালা নেই । তবে সুবিধা হল রুমটার সাথে এটাচড একটা বাথরুম আছে । এইসব সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করে এবং অনেকটা বাধ্য হয়ে ঐ রুমটাতেই উঠতে হল শ্রেয়াকে ।

শ্রেয়ার রুমমেটের নাম সোমা । ওর জুনিয়র মেয়েটি । বেসরকারী একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে।

রুমের অর্ধেকেরও বেশি জায়গা জুড়ে সোমার জিনিসপত্র দিয়েই ভর্তি। সেগুলোর মধ্যে বেশিবভাগই হল রুপচর্চার সামগ্রী আর বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পারফিউম । আর বিছানা-টেবিল-শেলফ-মেঝে পর্যন্ত ছড়ানো ছিটানো বইয়ের স্তূপ ।

শ্রেয়ার নিজস্ব জিনিসপত্রের সংখ্যা নিতান্তই কম । প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনোকিছু বয়ে বেড়াতে পছন্দ করে না সে । আর শ্রেয়া যতটাই পরিপাটী সোমা ততটাই অগোছালো । নতুন রুমে প্রথম রাতটা খুব অস্বস্তিতেই কাটে শ্রেয়ার । পরদিন নিজের জিনিসপত্র গোছানোর সাথে সাথে সোমার অগোছালো বইয়ের স্তূপ, টেবিল, বিছানা সব গুছিয়ে রুমটা একদম পরিপাটী করে সাজিয়ে ফেলে শ্রেয়া ।

বিকেলবেলা ক্লাস থেকে এসে সোমা প্রথমে ভাবে যে সে বোধহয় ভুল করে অন্য রুমে ঢুকে পড়েছে । আবার রুম থেকে বেড়িয়ে যায় । তারপর যখন রুম নাম্বার দেখে বুঝতে পারে যে এটা তারই রুম সে অবাক হয়ে যায় । ভীষণ খুশিও হয় । রুমে ঢুকে সোমা পঞ্চাশ বার শুধু শ্রেয়াকে বলতে থাকে যে আজ রুমটায় তার খুব শান্তি শান্তি লাগছে । এজন্য শ্রেয়াকে সে অনেক ধন্যবাদ দেয় । এভাবে দুই রুমমেটের মধ্যে অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক ঘনিষ্ঠতা হয়ে যায় ।

খুব সকালেই ক্লাস শুরু হয় শ্রেয়ার । ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায় । শ্রেয়া যখন রুমে ফেরে রোজই দেখে সোমা খুব সেজেগুজে বেড়িয়ে যায় । সে আবার রুমে ফেরে রাত দশটার দিকে । এরপর যদিও সোমা সারারাত জেগে পড়ালেখা করে কিন্তু এগারোটা বাজতে বাজতে শ্রেয়া ঘুমিয়ে পড়ে । আবার ভোরে যখন শ্রেয়া ঘুম থেকে ওঠে সোমা তখন ঘুমাতে যায় । তাই ওদের বিশেষ কথাবার্তা হয় না ।

তবে শুক্রবারের দিনটা দু’জনই সারাদিন রুমে থাকে । সেদিন অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমায় ওরা । ঘুম থেকে উঠে ভাল-মন্দ কিছু একটা রাঁধে । তারপর দু’জনেরই শুরু হয় পুরো সপ্তাহ জুড়ে জমিয়ে রাখা কাপড় ধোয়া । এসব শেষ করে দু’জন নামাজ পড়ে । নামাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও শ্রেয়া দেখে সোমা হাত তুলে শূন্য দৃষ্টিতে চুপচাপ তাকিয়ে থাকে । দীর্ঘক্ষণের জন্য এভাবেই কোথায় যেনো হারিয়ে যায় সে ।

সোমার ভেতরের সেই তোলপাড় নিয়ে কখনো প্রশ্ন করা হয় না শ্রেয়ার । তারপর দুপুরের খাওয়া শেষ করে দু’জন মুভি দেখতে বসে । এভাবেই কাটে তাদের রোজকার জীবন আর ছুটির দিনগুলো ।

বেশ কিছুদিন পর শ্রেয়া বুঝতে পারে রোজ সন্ধ্যায় সেজেগুজে অন্য একটা রঙ্গীন দুনিয়ায় যায় সোমা । এটা বুঝতে পারার পর শ্রেয়া মনে মনে ঠিক করে মাসটা শেষ হলে রুমটা ছেড়ে দেবে । সোমাকে খুব ঘৃণা করতে ইচ্ছে হয় শ্রেয়ার কিন্তু কিসে যেন বাঁধা দিতে থাকে তাকে । মনে হয় কোথায় যেন একটা ভুল আছে ।

সোমা অনেক ভাল ছাত্রী । পড়ালেখার খরচও সে টিউশনি করে চালায় । মাত্র কিছুদিনে অনেক আন্তরিক একটা সম্পর্ক হয়ে গেছে তার সাথে শ্রেয়ার । কোনোভাবেই তো তাকে এত খারাপ মেয়ে মনে হয় না । এমনকি একদিন শ্রেয়া এত অসুস্থ হয়ে পড়ল যে তাকে হসপিটালে ভর্তি হতে হল । সেদিন সন্ধ্যায় প্রথম সোমা কোথাও গেল না ।

সারারাত হসপিটালে শ্রেয়ার পাশে বসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল । শ্রেয়াকে সাহস দিয়ে নিজেই ঝরঝর করে কাঁদতে শুরু করল । হসপিটাল থেকে ফিরে এসে শ্রেয়া আর পারল না রুমটা ছেড়ে চলে যেতে ।

প্রায় রাতেই নিঃশব্দে খুব কাঁদে সোমা । এক রাতে শ্রেয়া তার কাছে জানতে চায় এমন কী কষ্ট তার যেজন্য সে প্রায় রাতেই এভাবে কাঁদে? সে সোমাকে সবকিছু বলার জন্য অনুরোধ করে । তাকে আশ্বস্ত করে যে সে কাউকেই কখনও কিছু বলবে না । এটা নিশ্চিত হয়ে প্রচণ্ড কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে সোমা বলতে শুরু করে- “ওর বাবা একজন অফিসার ছিলেন । ওদের বাড়ি, গাড়ি সবকিছু ছিল । কিন্তু এক সময় হঠাৎ করে তিনি খুব অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে যান । ওর জন্মের সময়ই ওর মা মারা যায় । ওর বাবা বিছানায় পড়ে যাওয়ার পর ওর সৎ মা জোর করে ওকে এক দালালের মাধ্যমে এই পেশায় দিয়ে দেয় । আর প্রতি মাসে এসে সব টাকা নিয়ে চলে যায় । ও এসব করতে না চাইলে ওকে অনেক মারধোর করে । এসব থেকে ওর কোনো মুক্তি নেই । মানুষ ওকে খারাপ চোখে দেখে । ও কোনোদিন কল্পনাও করেনি ওর জীবনটা এমন হয়ে যাবে । কেন ওর সাথেই এমন হতে হল?” সোমার কাছ থেকে এসব কষ্টের কথা শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে যায় শ্রেয়া ।

সোমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার আর কোনো ভাষা খুঁজে পায় না । সবকিছু জানার পর শ্রেয়া নিজেও মনে মনে সোমার মুক্তির পথ খঁজতে থাকে । এমন একটা পথ যার মাধ্যমে সোমা তার মাকে মাসে মাসে অনেকগুলো টাকা দিতে পারবে । তার মা সন্দেহ করতে পারবে না আবার সময়ও কম লাগবে যেন সে পড়ালেখা করার সময় পায় । এমন একটা পথ বেরও করে ফেলে শ্রেয়া । বেশকিছু জিমে কথা বলে দু’ঘণ্টা কন্ট্রাক্টে সোমার কাজের ব্যবস্থা করে ফেলে শ্রেয়া ।

এভাবে মাস শেষে সোমা তার মাকে অনেকগুলো টাকাও হাতে ধরিয়ে দিত । কিন্তু একদিন ক্লাস থেকে ফিরে এসে শ্রেয়া দেখে অসময়ে বিছানায় এলিয়ে পড়ে আছে সোমা । ওর সারা শরীরে বেদম পেটানোর দাগ । সোমা কাঁদতে কাঁদতে জানায় ওর মা সব জানতে পেরেছে, দালাল সব বলে দিয়েছে । কাল থেকে তাকে আবার ঐ কাজে যেতে হবে । নইলে তার ভার্সিটিতে সব জানিয়ে দেওয়া হবে যে সে একটা কল গার্ল ।

শ্রেয়াকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদে সোমা । সোমার আঘাতের জায়গাগুলোতে ওষুধ লাগিয়ে দেয় শ্রেয়া । ওর মনটাকে একটু হালকা করতে ওকে নিয়ে বাইরে বেড়াতে যেতে চায় । কিন্তু সোমা যেতে চায় না ।

এক সময় খুব বিস্ময়ের সাথে শ্রেয়াকে প্রশ্ন করে, “তুমি কি সত্যিই আমার সাথে বাইরে যাবে? আমার সাথে তো ভাল মেয়েরা কেউ যেতে চায় না । তোমার খারাপ লাগবে না?” শ্রেয়া উত্তর দেয়, “না । আমার অনেক ভাল লাগবে । কারণ আমি পৃথিবীর সবচেয়ে লক্ষ্মী একটা মেয়ের সাথে বাইরে যেতে চাইছি ।”

বিকেলটা খুব আনন্দে কাটে দু’জনের । সোমার চোখেমুখে অদ্ভূত একটা আনন্দের প্রতিফলন দেখা যায় যা ক্ষণিকের জন্য হলেও মলিন করে দিতে সক্ষম হয় ওর কষ্টগুলোকে । এভাবে সময় গড়াতে গড়াতে একদিন শ্রেয়ার চলে যাওয়ার সময় চলে আসে । সেদিন শ্রেয়াকে শেষ সম্বলের মতো আঁকড়ে ধরে অনেক কাঁদে সোমা । আসলে তার জীবনে কখনই শ্রেয়ার মতো কোনো মানুষ আসেনি তাকে এতটা আপন করে নেওয়ার মতো । কিছুতেই তাকে শান্ত করতে পারে না শ্রেয়া । যাওয়ার সময় শ্রেয়া সোমাকে বলে যায় যত বাঁধাই আসুক সে যেনো পড়ালেখা থামিয়ে না দেয় । পড়ালেখা শেষ করে কোথাও একটা চাকরী জোগাড় করে চলে যায় যেখানে তাকে কেউ চিনবে না । তখন সে জীবনটাকে আবার নতুন করে শুরু করতে পারবে । আর তার আশেপাশে তখন অনেক মানুষ থাকবে তাকে আপন করে নেওয়ার মতো ।

শ্রেয়া চলে যাওয়ার পর আর কোনোদিন ফোনেও কথা হয়নি তাদের । শ্রেয়া ফোন দিলেও কোনো এক অজানা কারণে সোমা কখনো তার ফোন ধরেনি ।

প্রায় আড়াই বছর পর শ্রেয়ার কাছে একটা ফোন আসে সোমার । সে জানায় তার পড়ালেখা শেষ । সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছে । অন্য এক শহরে চাকরীও হয়ে গেছে তার । আর সে সেই অচেনা শহরে নতুন একটা জীবনের উদ্দ্যেশ্যে রওনা হচ্ছে ।

এভাবেই শ্রেয়ার চেনা চেনা স্বপ্নগুলোকে ঘিরে কোনো এক অচেনা শহরে এখন হয়তো মুক্ত জীবনের ঘ্রাণ নিচ্ছে সোমা ।


লেখকঃ বাংলাদেশের শেষ প্রান্তের বিখ্যাত এক জেলা ঠাকুরগাঁয়ে তার জন্ম। শৈশব থেকেই কবি নন, তবে জীবন তাকে উপহার দিয়েছে অনেক কবিতা। জীবনের প্রয়োজনে প্রিয় স্বদেশ আর শৈশবের টাঙ্গন থেকে দূরে আছেন এই কবি।

কবিতা দিয়ে শুরু করলেও গল্প লেখাতেও যে অনাগ্রহ নাই, তা আমরা বুঝতে পারি।

মতামত দিনঃ