সরকার যখন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছিলো তার আগে থেকেই ঘরে ছিলাম, ইনফ্যাক্ট ২০ মার্চ, ২০২০ থেকেই ছিলাম ঘরে। মার্চের ১২ তারিখ থেকে বাইরে যাওয়া বন্ধ ছিলো, শুধু অফিস বাদে। আমার বাবাও শেষ মসজিদে নামাজ পড়েছেন মার্চের ১২ তারিখে। তারপর থেকে গ্রোসারী থেকে শুরু করে যাবতীয় প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি (ঔষধসহ) অনলাইনেই অর্ডার ও ডেলিভারি নিতাম। ডিসইনফেক্ট করার প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থাই নেয়া হয়েছিলো সাধ্যের মধ্যে।

যেহেতু আমি অফিস করছিলাম (বাসা অফিসের কাছে হওয়ায়) অফিসে যাতায়াতের সময় হেটেই যাতায়াত করেছি। সরাসরি বাসা থেকে অফিস, অফিস থেকে বাসা। অরিজিনাল কেএন৯৫ মাস্ক, চোখে চশমা পরে অফিসে যেতাম, সাথে স্প্রে করা যায় ৮০% এলকোহলযুক্ত একটা হ্যান্ড স্যানিটাইজার থাকতো সবসময়। একটু পর পরই হাত হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে পরিষ্কার করতাম।

অফিস থেকে বাসায় এসে সোজা বাথরুমে ঢুকে গরম পানি দিয়ে গোসল করতাম এবং কাপড় চোপড় সব ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে ফেলতাম। সেসব আইটেম ধোয়া যেতো না সেগুলো ভালোমতো স্যানিটাইজার স্প্রে করে ডিসইনফেক্ট করে ফেলতাম। এতোসব বলা এটা বুঝাতে যে আমার প্রস্তুতি বা সতর্কতায় কোন ঘাটতি ছিলনা। যাই হোক এবার আসল ঘটনায় আসি।

পূর্ব উপসর্গ

প্রথম লক্ষণ খেয়াল করি এপ্রিলের ২৫ বা ২৬ তারিখে গলায় খুবই মৃদু খুশখুশে ভাব, যা সব সময় থাকতো না। এসির বাতাস বা নরমাল পানি খেতে একটু অস্বস্তি বোধ হতো। এছাড়া, গলায় হালকা মৃদু ব্যথা ভাব ছিলো, যা মাঝে মাঝে গলা ঘেমে গেলে বোঝা যেত।

এপ্রিলের ২৮ তারিখ সন্ধ্যায় ইফতার করি, ইফতারের পরপরই পেটে অস্বস্তি অনুভব করছিলাম এবং হঠাৎ কোন কারণ ছাড়াই পাতলা পায়খানা হয়। পরপর দুইবার টয়লেটে যাবার পর পাতলা পায়খানা চলে যায়, কিন্তু পেটের নিচের অংশে অস্বস্তির ভাব ছিলো। রাতে আরও একবার টয়লেট হয়। দুবার টয়লেট হবার পরে আমি কিছুটা চিন্তিত হই, কারণ ইন্টারনেটের কল্যাণে মোটামুটি নির্ভরযোগ্য যেসব ওয়েবসাইট আছে (ডব্লিউএইচও, সিডিসি ইত্যাদি) তাতে হালনাগাদ তথ্য যা দেওয়া হয় সবই জানা আছে। আর যেহেতু আমি নিয়মিত অফিসের কাজে বাইরে যাচ্ছিলাম তাই আমি নিজেকে মোটামুটি করোনায় আক্রান্ত ধরে নিয়ে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেললাম, এবং অন্য একটা ঘরে চলে গেলাম তৎক্ষণাৎ। মানে নিজেকে পরিবারের সদস্যদের থেকে আলাদা করে ফেললাম মুহূর্তের সিদ্ধান্তেই। তখনো ওয়াইফ কে জানাইনি।

ফোনে পরিচিত ডাক্তার বড় ভাইয়ের সাথে কথা বললাম। তিনি বললেন আইসোলেশানে চলে যেতে আর আইইডিসিআর এ ফোন দিয়ে স্যাম্পল কালকশানের জন্য একটা সিরিয়াল দিয়ে রাখতে। সাথে তিনি কিছু ঔষধ সাজেস্ট করলেন এবং কিছু ঘরোয়া ব্যবস্থা নিতে বললেন, ইন্টারনেটের কল্যাণে সবাই ই মোটামুটি জানেন এইগুলো, তারপরেও আলাদা করে শেয়ার করবো কি কি করেছি। ট্র্যাক রাখার সুবিধার্থে এপ্রিলের ২৮ তারিখকে প্রথম দিন (ডে জিরো)  হিসেবে ঠিক করে নিলাম।

ব্যবস্থা নেয়া শুরু

আইইডিসিআর এর ফোন দিলাম ডাক্তারের পরামর্শ মতো। কিন্তু তেমন কোন রেস্পন্স পেলাম না। এরপরে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের অর্গানাইজিং সেক্রেটারি আমার ব্যাচমেট মান্না ভাই (এইউএম মান্না ভূঁইয়া) এর ফেসবুক ইনবক্সে যোগাযোগ করলাম যে আমরা যারা অফিস করছি কাউন্সিল তাঁদের জন্য পরিক্ষা করাতে বা হাসপাতালে ভর্তি করতে  কোন সহযোগিতা করতে পারবে কি না, একই কথা আমি কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার স্যারের ফেসবুক ইনবক্সেও লিখলাম। মান্না ভাই আমাকে জানালেন তারা এই ব্যাপারে গভর্নর স্যারের সাথে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রেখে যাচ্ছেন। এর মধ্যে শাহরিয়ার স্যার ইনবক্সে আমার নাম্বার নিয়ে আমাকে ফোন করলেন, এবং কিছু পরামর্শ দিলেন কিভাবে সহজে পরীক্ষা করাতে পারবো। এইসবের মধ্যে আমি আমার জিএম স্যারকে ফোনে জানালাম আমার কিছু সন্দেহজনক উপসর্গ আছে, আগামী কাল পরীক্ষা করাবো।

(২য় দিন) এপ্রিলের ২৯ তারিখ ভোরবেলা গেলাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) এর ফিভার ক্লিনিকে, সেখানে দুটি লাইন ছিলো। একটা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আর একটি সাধারনের জন্য। সরকারি কর্মকর্তাদের লাইনে সকাল সাতটায় দাড়ালাম। অনেক অপেক্ষা, আর তিনটা (প্রথমে রাস্তায় ভেতরে ঢোকার লাইন, পরে আউটডোর টিকেট কেটে ডাক্তার দেখানোর সিরিয়াল, সবশেষে স্যাম্পল দেয়ার সিরিয়াল) লাইন শেষে আমার স্যাম্পল দিয়ে আসলাম। বাইরে বের হয়ে দেখি ঘড়িতে দুপুর ১২.২০ বেজে গেছে।

এদিন রোজা রেখেছিলাম, সারাদিন পরে বাসায় এসে রেস্ট নিলাম। গলার খুশখুশে ভাব বেড়ে গিয়েছিলো সারাদিন রোদে দাঁড়িয়ে থেকে। ইফতারে গরম পানির শরবতসহ ইফতার করলাম। এর পরে আগের দিনের মতো আবার পাতলা পায়খানা হলো একবার। ইফতারের পরেই ডাক্তারের সাথে অনেকক্ষণ কথা বলে ফোন রেখে দেখি বিএসএমএমইউ এর ফিভার ক্লিনিক থেকে আমি করোনা পজেটিভ এই এসএমএস দিয়েছে। আমার ওয়াইফকে আগেই মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে বলেছিলাম। তারপরও রেজাল্ট পাবার পরে বাসায় একটা ইমোশনাল ব্রেক ডাউন হয়। বলে রাখি, বাসায় আমার বাবা, মা আছেন যাদের বেশ কিছু কো-মরবিড ইস্যু আছে যা করোনার ক্ষেত্রে রেড ফ্ল্যাগড। এছড়া ওয়াইফও প্রেগন্যান্ট, সাথে দুই বছর আটমাসের বাচ্চা। সবমিলিয়ে বেশ জটিল একটা অবস্থা ছিলো।

যাই হোক ডিনায়ালে না গিয়ে আগের মানসিক প্রস্তুতি অনুযায়ী প্রিপারেশন শুরু করলাম।

প্রস্তুতি

যদিও আগে থেকেই আইসোলেশন শুরু করেছিলাম, টেস্টের রেজাল্ট না আসায় মানসিকভাবে অতটা কঠোর আইসোলেশন শুরু করিনি। রেজাল্ট আসার পরে সবার আগে ব্যবহারের টয়লেট আলাদা করে ফেললাম, নিজের খাবার দাবার আর আনুষাঙ্গিক তৈজসপত্র আলাদা করে ফেললাম। এবার শুরু হয়ে গেলো পুরোপরি কঠোর আইসলেশন। বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিস বাসায় ছিলোনা, অনলাইনে আনিয়ে নিলাম। একটা ওয়াটার হিটার, অক্সিমিটার, নেবুলাইজার মেশিন এর সাথে ঔষধ (Windel Plus 3 ml) প্রেসার মাপার ডিজিটাল মেশিন, ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ঔষধ পত্র। ঔষধ পত্র বাড়ির সবার জন্যেই আনালাম, অবশ্যই একজন রেজিস্টার্ড ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী। একটা ছোট্ট নোটঃ ডাক্তারের পরামর্শের জন্য জাতীয় তথ্য বাতায়নগুলো খুব উপকারী বা হেল্পফুল না।

উপসর্গ ও ব্যবস্থাপনা

এবার আসি দিন ভিত্তিক উপসর্গে।

১ম দিন (২৮-০৪-২০২০) প্রথম দিন সন্ধ্যায় ইফতারের পাতলা পায়খানা শুরু হয়, সাথে খুশখুশে কাশির অনুভুতি ছিলো। বুকের মাঝ (স্টার্নাম) অঞ্চলে হালকা ব্যথা ছিলো। জ্বর ছিলোনা একদমই। শুধু গরম পানি খাওয়া শুরু করেছি। এদিন সারাদিন অফিস করেছি।

২য় দিন (২৯-০৪-২০২০) সারাদিন পাতলা পায়খানা না থাকলেও সন্ধ্যায় ইফতারের পরে পাতলা পায়খানা শুরু হয়, সাথে খুশখুশে কাশির অনুভুতি ছিলো। বুকের মাঝ (স্টার্নাম) অঞ্চলে হালকা ব্যাথা ছিলো প্রথম দিনের মতোই। জ্বর ছিলো না একদম। গরম পানি খাওয়া চালু ছিলো। এর মধ্যে রাত সাড়ে আটটায় করোনা পজিটিভ কনফার্মেশন মেসেজ আসে। এর পর থেকে ঔষধ (এজিথ্রোমাইসিন ৫০০ এমজি এবং মন্টেলুকাস্ট ১০ এমজি) খাওয়া শুরু করে দেই। বাকী ঔষধ বাসায় না থাকায় অনলাইনে অর্ডার করি। রাতে গরম পানির ভাপ নিই দুইবার ৫ মিনিট করে। ভাপ নেয়ার জন্য বড় স্টিলের মগ ব্যবহার করা শুরু করি। এদিন অনেক ফোনকল রিসিভ করেছি, সব মিলিয়ে প্রায় শ খানেক ফোনকল রিসিভ করেছি। এছাড়া নিজেও দুজন পরিচিত ডাক্তারের কাছে ফোন দিয়ে ঘন্টাখানেকের মতো কথা বলেছি। দিনটা কিভাবে কেটে গেছে বুঝতে পারিনি। এর মধ্যে একজন ডাক্তার আমার সাথে একই দিন তার কোভিড পজেটিভ রেজাল্ট পেয়েছিলেন, যদিও তিনি স্যাম্পল দিয়েছিলেন ২৫ এপ্রিল।

৩য় দিন (৩০-০৪-২০২০) সকালে ঘুম থেকে উঠার পর শরীরে হালকা ম্যাজমেজে ভাব ছিলো, বিছানা থেকে উঠতে ইচ্ছা হচ্ছিলো না। দূর্বল শরীরের সাথে হালকা গলা ব্যাথা ও  খুশখুশে কাশির অনুভুতি ছিলো। বুকের মাঝ (স্টার্নাম) অঞ্চলে হালকা ব্যাথা ছিলো প্রথম দুই দিনের চেয়ে একটু বেশি ছিলো। শ্বাস নিতেও কেমন যেন অস্বস্তি বোধ হচ্ছিলো। সকালে নাস্তা করে গরম পানি, চা (মগভর্তি), আদা লবঙ্গ মিশ্রিত চা এগুলা খাবার পরে শ্বাস নেয়ার অস্বস্তিভাব আর গলার খুশখুশ ভাব মোটামুটি চলে যায়। ভাপ নেয়ার জন্য স্টিলের মগ পরিবর্তন করে বড় বালতিতে ভাপ নেয়া শুরু করলাম, স্টিলের মগের স্বল্প ভাপে ঠিকমতো ভাপ নেয়া হচ্ছিলো না অনুভব করছিলাম। দিনে কমপক্ষে চারবার ৬-১০ মিনিট বড় বালতিতে চারলিটারের কাছকাছি ফুটন্ত গরম পানি নিয়ে ভাপ নিতাম। সাথে গরম পানিতে গোসল শুরু করলাম। গরম বা ঈষৎউষ্ণ পানি ছাড়া রুম তাপমাত্রার পানি পান করাও বাদ দিয়ে দিলাম। গরম ভাপটা খুব উপকারে আসা শুরু করলো। বিশেষ করে শ্বাস নেয়ায় সমস্যা মোটামুটি কমে গেলো। একবেলা করে নেবুলাইজার নিচ্ছিলাম। যদিও খুব কাজে দিচ্ছিলো মনে হয়নি তাই দুই দিন নিয়ে বাদ দিয়েছি। যাদের শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে আগে থেকে তাদের জন্য নেবুলাইজার খুব কার্যকরী জিনিস। মন চাঙ্গা রাখতে বন্ধুদের সাথে ফোনে ও সোশ্যাল মিডিয়ায় অডিও ও ভিডিও মাধ্যমে কথা বলা শুরু করেছি।

৪র্থ দিন (০১-০৫-২০২০) সকালে খুব ফ্রেশ হয়ে ঘুম থেকে উঠলাম। সময় কাটাতে এর মধ্যেই নেটফ্লিক্সের একটা বিখ্যাত সিরিজ যার বাংলা করলে দাড়ায় (গুগল ট্রান্সলেট ইউজ করে) কাগজের ঘর বা পেপার হাউজ দেখা শুরু করেছিলাম। সময় ভালোই কেটে যাচ্ছিলো। সকালে নাস্তা করে, চা, আদা-লবঙ্গ জল ইত্যাদি গ্রহণ শেষে পানির ভাপ নিতে নিতে দেখা যায় বারোটা বেজে যাচ্ছে। এর পর গোসল সেরে নামাজ, লাঞ্চ ইত্যাদি ততোদিনে রুটিনে পরিণত হয়েছে। হালকা বুক ব্যথা ছিলো, ইতোমধ্যে বুক ব্যাথা স্টার্নাম রিজিওন ছেড়ে ডানে-বামে ঘোরাঘুরি শুরু করেছে। অর্থাৎ বুকের বিভিন্ন জায়গায় ব্যাথা হচ্ছিলো, হালকা শ্বাসকষ্ট থাকলেও অতো পাত্তা দেইনি। অক্সিমিটার অর্ডার করলেও তখনো হাতে এসে পৌছায়নি। উপসর্গ অনেক কমে গিয়েছিলো। এর সাথে রুটিন পানির ভাপ, ঔষধ গ্রহণ অব্যাহত ছিলো। এছাড়া, বন্ধুদের সাথে কথা বলা তো ছিলোই।

৫ম দিন (০২-০৫-২০২০) শরীর ভালো বোধ হওয়ায় অনিয়ম করে বসলাম, অনেক রাত পর্যন্ত জেগে সিরিজ শেষ করলাম। ফলস্বরূপ নিয়মিত রুটিনে ব্যাঘাত। দেরী করে ঘুম থেকে উঠলাম। নাস্তা, পানির ভাপ নেয়া সব কিছুতেই দেরি হয়ে গেলো। লাঞ্চ করতে করতে দুপুর ৩.৩০ বেজে গেলো। অক্সিমিটার হাতে আসায় অক্সিজেন স্যাচুরেশন লেভেল দেখা শুরু করলাম প্রতি আধা ঘন্টায়। লেভেল আলহামদুলিল্লাহ্‌ ভালো ছিলো। ভালো মানে ৯৭%-৯৯% এর মধ্যে ছিলো। ডাক্তারের কাছে জিজ্ঞেস করে শুনলাম একজন সুস্থ মানুষের রক্তে অক্সিজেন স্যাচুরেশন লেভেল ৯৫% বা তার উপরে থাকে। শুধু পালস বেশ বেশি ছিলো, ডাক্তার বললেন ঔষধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হতে পারে। এছাড়া দিন বেশ নিশ্চিন্তেই কাটছিলো। উপসর্গ সব আগের মতোই হালকা ছিলো, শরীর একটু দুর্বল ছিলো। নিয়মিত মাল্টা, লেবুর শরবত খাচ্ছিলাম গরম পানীয় এর সাথে। আর ঔষধ চলছিলো প্রেস্ক্রিপশন অনুযায়ী। ঔষধ কিভাবে কি খেয়েছিলাম শেয়ার করবো, কিন্তু দয়া করে যেকোন ঔষধ খাবার আগে রেজিস্টার্ড চিকিৎসক এর পরামর্শ গ্রহণ করবেন। এর মধ্যে ঘুম অনেক কমে গিয়েছিলো আমার, ঘুমালেও একটু পরপর ঘুম ভেঙ্গে যেত।

৬ষ্ঠ দিন (০৩-০৫-২০২০) আগের রাতে বেশ রাত করে ঘুমিয়েছিলাম, সকালে দেরিতে ঘুম থেকে উঠলেও বেশ সতেজ লাগছিলো। বাকী সব আগের দিনের মতোই ছিলো। নিয়মিত রক্তচাপ ও অক্সিজেন লেভেল রিডিং নিচ্ছিলাম। সব নরমাল ছিলো। প্রাণীজ আমিষ খাওয়া হচ্ছিলো না জন্য দুপুরের খাবারে পরিমিত পরিমাণ (১০০-১৫০ গ্রাম) প্রাণীজ আমিষ খাওয়া শুরু করলাম। রোজার সময় হওয়ায় প্রায় প্রতিদিনই বাসায় ইফতারে তৈরী ভাজাভুজি খাওয়া হচ্ছিলো (যা পারলে পরিহার করা উচিৎ)। বিভিন্ন সময় বুকের বিভিন্ন জায়গায় (উপরে বামদিকে, ডানদিকে, নিচের অংশে, মাঝখানে) মাঝে মাঝে ব্যথা আর দুর্বলতা ছাড়া অন্য কোন উপসর্গ ছিলোনা। মূল ঔষধের ডোজ শেষ হয়ে যাওয়ায় ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করি। ডাক্তারের পরামর্শে এজিথ্রোমাইসিন আরও দুইদিন, মোট সাতদিন চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিই। রাতে একদম ঘুম হলোনা এ দিন। সকাল সাড়ে সাতটায় ঘুমালাম। বিখ্যাত সেই সিরিজের শেষ দুটো সিজন দেখার চক্করে না ঔষধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় তা বুঝলাম না। দেরীতে ঘুম আবার আমার চিকিৎসার রুটিন উল্টাপাল্টা করে দিলো। এদিন শরীরটা আবার ম্যাজম্যাজ করা শুরু করলো। বলে রাখা ভালো এর মধ্যে ইন্টারনেটে যেসব কোভিড সংক্রান্ত তথ্য আছে যা আমার কেইসের সাথে মিলে তেমন অনেক কিছুই পড়ে ফেললাম। কিন্তু তাতে যে হিতে বিপরীত হবে যদি জানতাম!

৭ম দিন (০৪-০৫-২০২০) সারারাত জেগে রইলাম, সকালে ৭.৩০ এর দিকে একটু ঘুম আসলো। দশটায় উঠলাম, নাস্তা করতে করতে এগারোটা। ডাক্তারকে জানালাম, তার মতে ঔষধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হতে পারে। তিনি আমাকে উত্তেজনা কমানোর ঔষধ দিলেন। নরমাল রুটিন কন্টিনিউ করছিলাম। মূল ঔষধের ডোজ শেষ হওয়ায় শুধু ভিটামিনের ডোজ চলছিলো। সন্ধ্যায় ইফতারের পর একটু খারাপ লাগতে শুরু করলো। হালকা বুক ব্যাথা, সাথে হাত পায়ে জোর পাচ্ছিলাম না। ঘন্টাখানেক শুয়ে থাকলাম এভাবে। আস্তে আস্তে খারাপ লাগা কেটে গেলো। শরীর একটু ভালোর দিকে যাবার পর আবার এইসব উপসর্গ শুনে একটা অনলাইন বাংলা পত্রিকার আর্টিকেল শেয়ার করলেন রাতে খাবার সময় (রাত ৯-৯.৩০ টার দিকে)। বলে রাখা ভালো আর্টিকেলের মূল শিরোনাম ছিলো করোনা ভাইরাস সংক্রমণের পঞ্চম থেকে পরের দশদিন কেন গুরুত্বপূর্ণ। বলাই বাহুল্য, আর্টিকেলটা খুব মনযোগ দিয়ে পড়লাম এবং হিসেব করে দেখলাম যে আমি ঠিক এই সময়টাই পার করছি। যাই হোক রাতে আরও দু এক বার শরীর খারাপ করলো। বুকে ব্যথা, শ্বাস নিতে কষ্ট। পালস অক্সিমিটারে রিডিং নিচ্ছিলাম অবিরত। সব রিডিং ই ৯৭% এর উপরে ছিলো অক্সিজেন স্যাচুরেশন। এর মধ্যে আবার কিছু দিন আগে ভোগা ব্যাকপেইন ফেরত আসলো। সবমিলিয়ে এই আক্রান্ত হবার পর এই প্রথম মিশ্র একটা দিন পার করলাম, যার প্রতিক্রিয়ায় প্রচন্ড মানসিক চাপের সম্মুখীন হলাম। শুরু থেকেই মানসিকভাবে প্রচন্ড শক্ত থাকার চেষ্টা করেছি, পরিবারের বাকী সদস্যদের সামাল দিতে এছাড়া উপায় ছিলোনা। But once the barriers break down, it takes a huge toll on you mentally. অর্থাৎ একবার যদি মানসিক চাপ নেয়া শুরু করেন, এটা আস্তে আস্তে বাড়বে, বাড়তে বাড়তে আপনাকে লিটারালি প্রেসার কুকারে ঢুকিয়ে দিবে।

৮ম দিন (০৫-০৫-২০২০) রাতে ঘুম কম হলো। সকালে খুশখুশে কাশি শুরু হলো, নাস্তা করার পরে লুজ মোশন শুরু হলো। বুকে ব্যাথা, শ্বাস কষ্ট ফেরত আসলো। রুটিন মতো সব কাজ করে যাচ্ছিলাম, গরম পানির ভাপ নেয়া, চা পান করা, আদা-লবঙ্গ পানি চালিয়ে গেলাম। পালস অক্সিমিটার রিডিং অনুযায়ী অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৯৭-৯৮% এর মাঝে ছিলো। কিন্তু পালস বেড়ে ১১০ এর উপরে চলে গেলো। কয়েকটা উপসর্গ বেড়ে যাওয়ায় মানসিকভাবে প্রচন্ড চাপ অনুভব করলাম। ডাক্তারকে কাশি আর লুজ মোশনের কথা জানানোর পরে স্যালাইন খাবার পরামর্শ দিলেন, সাথে দুটো ঔষধ যদি পেট ব্যাথা থাকে আর লুজ মোশন বন্ধ না হয়। বিকেলে ঘুমাতে পারলাম না। সন্ধ্যায় (রোজা ছিলাম না, সময়ের ধারণা দিতে) ইফতারের পর খারাপ লাগতে শুরু করলো। বাসায় ইফতারের ভাজাভুজি খেয়েছিলাম। হার্ট রেট অনেক বেড়ে প্রায় ১১০-১১৫ এর মতো হলো। সন্ধ্যায় অনেকের সাথে রুটিন মতো কথা বলতাম। সেটা বাদ দিয়ে শুয়ে থাকলাম। রাত নয়টার দিকে একটু ভালো লাগতে শুরু করলো। কোনমতে রাতের খাবার খেয়ে আর গরম পানির ভাপ নিয়ে শুয়ে পড়লাম রাত ১১.৩০ এর মধ্যে। এটাই সবচেয়ে আগে ঘুমিয়ে পরার রেকর্ড এই আইসোলেশন পিরিয়ডে।

৯ম দিন (০৬-০৫-২০২০) সকালে মোটামুটি ভোরবেলায় ঘুম ভেঙ্গে গেলো। মোটামুটি শরীর ভালো লাগছিলো। ঘুম থেকে উঠে অনেকগুলো খেজুর খেয়ে ফেললাম। রোজার শুরুতেই বেশকিছু আজওয়া খেজুর এনে রেখেছিলাম। খেজুর সারাদিনই খেতাম। এদিন সকালে উঠেই বেশ কিছু খেজুর খেলাম আর বিছানায় শুয়ে থাকলাম। সাড়ে আটটা নাগাদ নাস্তা করে ফেললাম। বুকের ব্যাথা ছিলো, শ্বাসকস্টের ভাবও ছিলো। কিন্তু খুব বেশি না, আর ঔষধ খাওয়ায় লুজ মোশন বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। সারাদিন শুয়ে বসে কাটালাম।

কিছুই ভালো লাগছিলো না, সব থেকে খারাপ বিষয় ছিলো বাসার কারও সাথে কিছু শেয়ার ও করতে পারছিলাম না। এমনিতেই কাঁদতে কাঁদতে আমার মা আর ওয়াইফ এর অবস্থা খারাপ। বাবার চোখের দিকেও তাকানো যায়না। অনেক মনের জোর জড়ো করে নিয়মিত রুটিন কাজগুলো চালিয়ে গেলাম। দুপুরে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। মিনিট বিশেক ঘুমের পরে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। কম্পিউটারে থাকা মুভি কালেকশানের সবচেয়ে হালকা মুভিটা ছেড়ে বসলাম। কিছুতেই মনঃসংযোগ করতে পারলাম না। ইউটিউবে স্ট্যান্ড আপ কমেডি দেখার চেষ্টা করলাম। এরকম মানসিক অবস্থায় আসলে কিছুতেই মনঃসংযোগ করা সম্ভব হচ্ছিলো না।

সন্ধ্যায় ইফতার করলাম মানে বাসার ইফতারে যেসব ভাজাভুজি করে সেগুলো খেলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভয়ানক খারাপ লাগতে শুরু করলো। বুকে চাপ দিতে লাগলো, শ্বাস নিতে কষ্ট হতে শুরু করলো, হাত পা সব অসাড় হয়ে যেতে শুরু করলো। বুক ধড়ফড় করতে শুরু করলো আর সাথে ঘামতে শুরু করলাম এবং শরীর ঠান্ডা হয়ে আসতে লাগলো। ভয়ানক ভয় পেলাম।

প্যানিক এটাক বা এংজাইটি এটাক সম্পর্কে আগেই পড়া ছিলো, কিন্তু এরকম বাজে অভিজ্ঞতা হতে পারে ধারণাও ছিলো না। বুঝতে পারছিলাম হয়তো এংজাইটি বা প্যানিক এটাক হবে, কারণ অক্সিমিটারে অক্সিজেন স্যাচুরেশন দেখাচ্ছিলো ৯৭-৯৯%। এর মধ্যে ইমার্জেন্সী হলে কোন হাসপাতালে যাবো কিভাবে যাবো এটা জানার জন্য কাউন্সিলে আমার ব্যাচমেটকে নক দিলাম। সে বললো খোঁজ নিচ্ছে। সাথে আরকজনের সাথে কথা বললাম যিনি আমাকে আমাদের অফিসের একজন ডাক্তারের সাথে কথা বলিয়ে দিলেন। কিন্তু হিতে বিপরীত, সে ডাক্তারকে আমি তাকে যতোই বলি অক্সিজেন স্যাচুরেশন ভালো দেখাচ্ছে, তিনি ততোই বলেন ডিভাইসে ভরসা না করে হাসপাতালে যেতে। আমি বলার চেষ্টা করি যে প্যানিক এটাক হতে পারে, কিন্তু তিনি মনে হয় অন্য কাজে ব্যস্ত থাকায় আমার কথা ঠিকমতো না শুনেই হাসপাতালে গিয়ে হাইপ্রেশার অক্সিজেন (৪+লিটার পার মিনিট) নিতে বললেন। উনার সাথে কথা বলে মানসিক চাপ আরও বেড়ে গেলো এবং শরীর আরও খারাপ হয়ে গেলো। এর মধ্যেই আমার ডাক্তারকে এসএমএস দিয়ে রাখলাম আমার কনসাল্টেশন দরকার। উল্ল্যেখ্য তিনি ঢাকার একটি সরকারী হাসপাতালে কর্মরত আছেন এবং বাংলাদেশে প্রথম কোভিড১৯ এর প্লাজমা দান করেছেন। তিনি সাথে সাথে আমাকে কল করলেন এবং তার সাথে কথা বলার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আস্তে আস্তে শ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক হতে শুরু করলো এবং আধাঘন্টা তার সাথে কথা শেষে মোটামুটি স্ট্যাবল হয়ে গেলাম। তিনি আমাকে কনফার্ম করলেন যে এটা প্যানিক এটাক। তিনি আমাকে জেনেরিক ক্লোনাজিপাম ০.৫ এমজি খাবার জন্য সাজেস্ট করলেন, বললেন এমন হলে এই ঔষধ খেয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করতে।

আমার অফিসের ডাক্তার দেড় ঘন্টা পরে ফোন করলেন আমাকে, জানালেন এটা এংজাইটি থেকে হতে পারে। কিন্তু আমার অন্য কোন হেল্প এর সোর্স না থাকলে হয়তো তার ফোনকল রিসিভ করার মতো অবস্থা হয়তো আমার থাকতো না। যাই হোক তাকে ধন্যবাদ দিলাম। অনলাইনে ঔষধের অর্ডার করলাম। বাসায় মার ঘুমের জন্য একই জেনেরিকের ঔষধ ছিলো। সেটা খেয়ে রাত দেড়টায় ঘুমিয়ে পরলাম। এখান থেকে একটা শিক্ষা পেলাম, বিপদে সঠিক সোর্স থেকে হেল্প না পেলে সে হেল্প বিপদ আরও বাড়াতে পারে। এই সংকটে একটা জিনিস নিশ্চিত করলাম ইমার্জেন্সী হলে কিভাবে কোথায় যাবো। কারণ আগে থেকে ডিসাইড না করা থাকলে, রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতেই জীবনাবসানের ঘটনাও কম না।

১০ম দিন (০৭-০৫-২০২০) সকালে ঘুম ভেঙ্গে গেলো, সারারাত ভালোই ঘুমালাম। সকালে বেশ সতেজ লাগলো। আবার সেই আগের রুটিন। গরম ভাপ নেয়া, গরম পানি, চা, আদা লবঙ্গ খাওয়া এগুলা চালাতে লাগলাম। বলে রাখা ভালো একটা রুকিয়াহ করেছিলাম বাকীসব ট্রিটমেন্টের পাশাপাশি। রুকিয়াহর প্রসিডিউরটা আলাদা করে দিয়ে দিবো। যারা জানেন না এটা শরীয়তসম্মত পন্থা বিভিন্ন বালা মুসিবত আর রোগবালাই দূর করার। সারাদিন ভালোই গেলো। অনেকের সাথেই কথা বার্তা বললাম। কিন্তু সন্ধ্যার পরে আবার বুক ধড়ফড় শুর হলো এবং প্যানিক এটাক হলো। প্যানিক এটাকের কমন সিম্পটম বুক ধড়ফড় করা, বুকে চাপ দেয়া, শ্বাসকষ্ট হয়া, হাত-পা অসাড় হয়ে আসা ইত্যাদি যা করোনার বিপদজনক লক্ষণের অনুরূপ। তাই প্যানিক এটাক আর করোনার বিপদজনক উপসর্গের একেবারে শুরুতেই মধ্যে পার্থক্য করা খুবই জরুরী। পালস অক্সিমিটার এক্ষেত্রে হোম ডায়াগনসিসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যাই হোক আমার রেগুলার ডাক্তারকে ফোন না দিয়ে আমার বন্ধু অন্য এক ডাক্তারকে ফোন দিলাম। তার সাথে ঘন্টাখানেক কথা বলে আস্তে আস্তে নরমাল হলাম। কথা শেষে একটা ক্লোনাজিপাম ০.৫ এমজি খেয়ে ঘুমানোর জন্য শুয়ে পড়লাম। চল্লিশ মিনিট পরে ভালো অনুভব করতে লাগলাম। পরে রাতের খাবার খেয়ে, একটা পুরাতন সিনেমা দেখে ঘুমিয়ে পরলাম।

১১তম দিন (০৮-০৫-২০২০) সকালে দেরী করে ঘুম থেকে উঠলাম, মোটামুটি সতেজ হয়ে উঠলাম। নাস্তা করলাম আর সাথে আগের রুটিন। গরম ভাপ নেয়া, গরম পানি, চা, আদা লবঙ্গ খাওয়া এগুলা কন্টিনিউ থাকলো। গত দুই দিনের অভিজ্ঞতায় বাসায় একটা ইমার্জেন্সী অক্সিজেন সিলিন্ডার এনে রাখার তাগিদ অনুভব করলাম। আমার কলিগ, যিনি কিনা অফিসের আনঅফিসিয়াল কোভিড১৯ রেসপন্স টিমের সদস্য, তার কাছে মেসেঞ্জার ইনবক্সে জিজ্ঞেস করলাম এমন কোন লিংক আছে কিনা। তিনি বেশ কয়েকটি ফেসবুক পেজের লিংক দিলেন দুপুর নাগাদ। এর মধ্যে একটি (এখানে নাম উল্লেখ করছি কারও যদি প্রয়োজন পরে) লিংক প্রিয়শপ নামের একটা ফেসবুক পেইজে যোগাযোগ হলো। তারা সাপ্তাহিক আর মাসিক ভিত্তিক সিলিন্ডার ফুল সেটআপ সহ ভাড়া দেয়। আবার সিলিন্ডার বিক্রিও করে।

আমি একমাসের জন্য ৫০০০ টাকায় একটা ফুল সেটআপ সহ অক্সিজেন সিলিন্ডার আনিয়ে রাখার অর্ডার করলাম। তাদের ডেলিভারি ট্রাক কাছাকাছি থাকায় বিকাশে ডেলিভারি চার্জ ৩০০ টাকাসহ পুরো টাকা পে করার ৪০ মিনিটের মধ্যেই বাসায় এসে সিলিন্ডার দিয়ে গেলো। সিলিন্ডার তো অর্ডার করলাম, কিন্তু বাসায় এটা  কিভাবে নিবে বুঝতে পারছিলাম না। তার মধ্যে দুপুর হওয়ায় মা আর ওয়াইফ ঘুমাচ্ছিলো। বাবাকে কোনরকম ব্যাখ্যা করে সিলিন্ডার বাসায় আনার ব্যবস্থা করলাম। বাবাকে খুব কনভিন্সড মনে হলো না। তিনি খুব খারাপ কিছু ধারণা করে বসে থাকলেন।

এর মধ্যে বিকেলে আমার ওয়াইফ আর মা ঘুম থেকে উঠে বাসায় অক্সিজেন সিলিন্ডার দেখে নার্ভাস হয়ে পরলো। সবাইকে অনেক বলে, অক্সিমিটারের রিডিং বার বার ইনবক্সে পাঠিয়ে কনভিন্স করতে সক্ষম হলাম যে এটা শুধু ইমার্জেন্সী যদি লাগে সেজন্য আনিয়ে রাখা। বলে রাখা ভালো এখন পর্যন্ত যা জানা গিয়েছে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই সিরিয়াস কেইসে রোগীদের হাইপোক্সিয়া (Hypoxia) হচ্ছে যেখানে রোগীদের অক্সিজেন লেভেল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রায় কমে যাবার পরে তারা শ্বাসকষ্টের ব্যাপারটা টের পাচ্ছেন, তখন হাসপাতালে ভর্তি হয়ে অক্সিজেন লেভেল আর ঠিক করা যাচ্ছে না বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই, আর খুব কম সময়ের ভেতরেই রোগী সাধারণ অবস্থা থেকে ক্রিটিক্যাল অবস্থায় চলে যাচ্ছে।

তাই, কোভিড ১৯ ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে রক্তে অক্সিজেন স্যাচুরেশন লেভেল মনিটর করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য পালস অক্সিমিটার একটা অত্যাবশ্যকীয় ডিভাইস বাসায় বসে কোভিড ১৯ ম্যানেজমেন্টে। উন্নত বিশ্ব ইআর (Emergency Room) বা ডাক্তারের কাছে ভিজিটের পর বেশিরভাগ কোভিড রোগীকেই এই ডিভাইস হাতে ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে (অবশ্যই ফ্রি নয়)। যাই হোক অক্সিজেন সিলিন্ডারের সিচুয়েশন ম্যানেজ করতে করতে ইফতারের সময় এগিয়ে আসলো। যতোই ইফতারের সময় এগিয়ে আসে ভয় বাড়তে লাগলো। পরে বাসার তৈরী ইফতার খেলাম। কিছুক্ষণ পরে সেই অনুভূতি ফেরত আসা শুরু করলো। ওয়াইফকে জানালাম একটু ঘুমাবো। ঘুম থেকে উঠে কল দিবো।

আগের দুদিনের অভিজ্ঞতা থাকায় আজকে ঘাবড়ে না গিয়ে ডাক্তারের প্রেস্ক্রাইব করা ঔষধ (ক্লোনাজিপাম ০.৫ এমজি) খেয়ে, সাথে কিছু গরম পানি পান করে আর মুখের ভেতরে লবঙ্গ দিয়ে বুকের উপর ভর দিয়ে শুয়ে রিল্যাক্স করার চেষ্টা করালাম। একের পর এক ওয়েভ আসতে থাকলো, আমি শক্ত হয়ে শুয়ে থাকলাম রিল্যাক্স হবার চেষ্টা করতে থাকলাম। এর মধ্যে কখন যেন ঘুমিয়ে পরলাম। ঘুম থেকে উঠে দেখি প্রায় ৫০ মিনিট পার হয়ে গেছে। অনেকটা সতেজও লাগছে। বড় এক মগ গরম পানি ও আদা-লবঙ্গ-গোল মরিচ সহযোগে চা পান করলাম। রাত দশটায় রাতের খাবার খেয়ে, কিছুক্ষণ ইন্টারনেটে ঘুরে ফিরে, একটা সিনেমা অর্ধেক দেখে প্রায় রাত ১ টায় ঘুমাতে গেলাম।

১২তম দিন (০৯-০৫-২০২০) সকালে ঘুম থেকে উঠে বেশ ভালো লাগছিলো। ঘুমটাও ভালোই হয়েছিলো। নাস্তা করে ঘরদোর পরিস্কার করতে শুরু করলাম, বাথরুম, কমোড, বেসিন এইগুলা সব পরিষ্কার করলাম। এর আগেও একদিন পরিষ্কার করেছিলাম, বাথরুম, কমোড, বেসিন। আর ঘর প্রতিদিন না পারলেও, দুইদিনে একবার ঝাড়ু দিতাম। ঘরদোর পরিষ্কার করে, আর ঘর গুছিয়ে মনটা বেশ ভালো লাগতে শুরু করলো। নরমাল রুটিনে মোটামুটি ঘটনা বিহীন দিন পার করলাম। বুকে হালকা ব্যথার অনুভূতি ছিলো তখনো। মাঝে মাঝে গলায় খুশখুশে অনুভূতি হতো। যা গত সপ্তাহখানেক ধরেই ছিলো। সন্ধ্যায় ইফতারের পরে প্রস্তুতি নিয়ে প্যানিক এটাকের অপেক্ষা করতে লাগলাম। দুই একটা ওয়েভ আসলেও আগের মতো এতো ভয়ানক ছিলোনা। আর আমার নতুন রুটিন মতো সন্ধ্যা সাড়ে আটটা পর্যন্ত ঘুমালাম ঔষধ খেয়ে। এই ঘুমের পরে বেশ সতেজ লাগতো। ঘুম থেকে উঠে চা খেলাম, আরও হালকা খাবার খেলাম। রাত সাড়ে দশটায় খেলাম রাতের খাবার। ঘুমালাম একটু রাত করে। মুভি দেখেছিলাম একটা পুরাতন।

১৩তম দিন (১০-০৫-২০২০) আজকে সকালে ঘুম থেকে উঠে বেশ ভালো লাগছিলো। একটু দেরি করেই উঠলাম। উপসর্গগুলো আজকে একটু কমতির দিকে মনে হলো। আগামী কালই ১৪তম দিন তাই ওয়াইফের সাথে পরীক্ষা করানোর ব্যাপারে পরামর্শ শুরু করলাম। শরীর যথেষ্ট দুর্বল থাকায় পিজিতে গিয়ে স্যাম্পল দেয়ার বিকল্প ভাবতে শুরু করলাম, খোঁজও নিলাম কয়েক জায়গায়। ডাক্তার বন্ধুর সাথে কথা বললাম, সে একটা প্রাইভেট হাসপাতাল সাজেস্ট করলো খোঁজ নিয়ে দেখতে। এর মধ্যে ব্যাচমেট কলিগ যিনি কিনা কাউন্সিলে আছেন তিনি খোঁজ খবর নিতে ফোন দিলেন, পরীক্ষা কোথায় করাতে চাই জানতে চাইলেন। মুগদা জেনারেল হাসপাতাল আমার বাসা থেকে কাছে হওয়ায় তিনি জানালেন সেখানে ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমি বন্ধুর দেয়া প্রাইভেট হাসপাতালের লিংক শেয়ার করলাম তার সাথে। দুজনেই খোঁজ খবর নিয়ে জানার চেষ্টা করবো বলে ফোন রাখলাম। ইফতারের পরে প্যানিক এটাক হালকা ওয়েভ নিয়ে আসলেও, প্রস্তুতি থাকায় তেমন কোন চাপে ফেলতে পারেনি। বরং ৫০ মিনিটের একটা রিফ্রেশিং ঘুম দিচ্ছিলাম।

১৩তম দিন (১১-০৫-২০২০) এদিন ঘুম থেকে উঠে মনে হচ্ছিলো সুস্থ হয়ে গিয়েছি (আসলে দিল্লি বহুদূর)। নরমাল রুটিন তাও চলতে লাগলো। এর মধ্যেই সেকেন্ড স্যাম্পল দেয়ার বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সেদিকে খোঁজ খবর বাড়ালাম, PRAAVA Health এর খবর পেলাম। শুনলাম ১৩ মে তারিখ থেকে ওরা বাসায় এসে স্যাম্পল নেয়া শুরু করবে। ওদের ফোন দিলাম জানার জন্য সকালে, প্রায় ১৩ মিনিট বিভিন্ন ধরনের মিউজিক শোনালো (আসলে কিউ এ রেখেছিলো), আর ধৈর্য্য না রাখতে পেরে লাইন কেটে দিলাম। ২-৩ ঘন্টা পরে ওরাই কলব্যাক করলো। ডিটেইল জানার চেষ্টা করলাম কথা বলে, ওরা ডিটেইল না দিয়ে শুধু কতো টাকা পে করতে হবে বারবার সেটাই বলে যেতে লাগলো। বিরক্ত হয়ে বললাম পরে কল করে কনফার্ম করবো। স্বাভাবিক রুটিন চলতে লাগলো, যদিও শরীর ভালো বোধ হওয়ায় রুটিনে একটু ফাকি দেয়া শুরু করলাম (বিশ্বাস করেন এতোদিন এই রুটিন ফলো করতে করতে ক্লান্তি ভর করবে প্রচন্ড, তবে স্ট্রিক্ট থাকতে হবে নাহলে রিকোভারিতে ডিলে হবে)। ভিটামিনের ডোজ ১০ দিনের থাকলেও ডাক্তারের পরামর্শে কন্টিনিউ করতে থাকলাম। সন্ধ্যায় আরও কিছু জায়গায় স্যাম্পল দেয়ার ব্যাপারে খোঁজ নিলাম। সব কিছু দেখেশুনে PRAAVA Health এ স্যাম্পল দেয়া অপেক্ষাকৃত কম ঝামেলার মনে হলো। যদিও এর জন্য একটা হেফটি চার্জ আছে, জনপ্রতি ৫৩৫০ টাকা।

১৪তম দিন (১২-০৫-২০২০) আস্তে আস্তে উপসর্গগুলো কমে যেতে শুরু করেছে অনুভব করলাম। রুটিন কিছুটা কমিয়ে আনলাম। এর পরের দিনগুলোয় মাঝে মাঝে হালকা প্যানিক এটাক ছাড়া মেজর কোন ইস্যু না থাকায় দিনভিত্তিক ম্যানেজমেন্টের বর্ণনা দেয়ার ইতি এখানেই। PRAAVA Health এ সকালেই কল দিলাম, ১৫ মিনিট ওয়েটিং রেখে ৩০ সেকেন্ড কথা বললেন এক্সিকিউটিভ। কথা বলার ধরনে মনে হলো তিনি কল ধরে রক্ষা করে ফেলেছেন, মেজাজটা খিচড়ে যাওয়ায় ধন্যবাদ বলে ফোন রাখলাম। এর মধ্যে ফোনের ব্যলেন্স কেটে ফেলেছে ৪০ টাকার বেশি। এর পরে PRAAVA Health এর কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে পিজি (বিএসএমএমইউ)তে যাবার চিন্তা করলাম। দুপুরের পর ওয়াইফকে জানাতেই সে প্রচন্ড বিরক্ত হলো আমার বাইরে যাওয়ার ডিসিশান শুনে। পরে অগত্যা PRAAVA Health এ কল দিলাম, চারটার পরে। তারা জানালো চারটা পর্যন্ত তারা পরের দিন অর্থাৎ ১৩ মে তারিখের স্যাম্পল কালেকশান করবেন। আমাকে সিরিয়াল দিতে হলে তার পরের দিন অর্থাৎ ১৪ মে তারিখের জন্য সিরিয়াল দিতে হবে। বিকাশে টাকা পে করলে তারা আমার স্লট কনফার্ম করবেন। এক্সিকিউটিভ যার সাথে কথা হচ্ছিলো, তিনি বললেন আধাঘন্টার মধ্যে পে করলে তিনি নিজেই কল করে কনফার্ম করবেন। আমি ফোন রেখেই পে করে দিলাম। কিন্তু তাদের কলের আর কোন দেখা নেই। এর পরে নিজেই কল করলাম, যিনি কল ধরলেন তিনি আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন পে করেছেন? আপনাকে কি কনফার্ম করা হয়েছিলো পে করার জন্য। আমি তাকে তার সিস্টেমে চেক করতে বললাম। তিনি চেক করে জানালেন যে টাকা তারা পেয়েছেন, কিন্তু এখনি আমাকে স্লট কনফার্ম করতে পারছেন না। মেজাজটা খারাপ হয়ে গেলো আবার। পরে তাদের ফেসবুক পেইজে কয়েকবার নক করে কনফার্ম করলাম ১৪ মে তারিখের স্লট। কিন্তু কখন স্যাম্পল নিতে আসবেন তা জানাতে পারলেন না, বললেন আগামীকাল (১৩মে ২০২০) জানাতে পারবেন। যাই হোক কনফার্মেশন পেয়েও মেন্টালি রিল্যাক্সড থাকলাম। দিনভিত্তিক ডায়েরী আপাতত এখানেই শেষ করছি। পরের টুকু স্যাম্পল কিভাবে দিলাম আর কি রেজাল্ট আসলো তার বিবরণ।

১ম স্যাম্পল (সর্বমোট ২য়) উপরেই বলেছি PRAAVA Health এ প্রথম স্যাম্পল দিয়েছি, অনেক ঝক্কি ঝামেলা পোহানোর পর আর যোগাযোগ শেষে তারা ১৪ মে ২০২০ তারিখ দুপুর ১২.৩০ এ আসে স্যাম্পল নিতে, কিন্তু ড্রাইভার আমার ঠিকানা চিনেন না। দশ মিনিট বুঝিয়ে বলার পর, নিজেই বের হলাম। কোথায় জিজ্ঞেস করলে একেক বার একেক নাম বলে প্রায় চল্লিশ মিনিট আমাকে ঘুরিয়ে, পরে স্পেসিফিক কি লেখা দেখতে পাচ্ছেন জিজ্ঞেস করলাম তখন তিনি একটা জায়গার নাম বলেন যা আমার বাসা থেকে তিন মিনিটের হাটা দূরত্বে। আমি সেখানে যাই, তারা আমাকে সেখানে রাস্তায় দাড় করিয়ে গাড়ির গ্লাসটা একটু ফাকা করে স্যম্পল নিয়ে যান। চব্বিশ ঘন্টা পরে রেজাল্ট ইমেইলে দেবার কথা থাকলেও তারা দুইদিন পরে রাত একটার পরে তাদের এপে (Pateint Portal App) আপডেট করে। সেখান থেকে কোভিড১৯ নেগেটিভ রেজাল্ট আসে। রেজাল্ট দিতে ওরা গড়িমসি করায় রাতেই ডিসিশান নিয়ে রেখেছি সকালে বিএসএমএমইউ এর ফিভার ক্লিনিকে যাবো, একটা রেন্ট এ কার এর গাড়িও আসতে বলে দিয়েছিলাম ভোর ৫.০০ টায়। কোভিড১৯ নেগেটিভ রেজাল্ট পেয়ে সবাইকে জানাতে উত্তেজনায় সারারাত আর ঘুমানো হয়নি। সকালে পাঁচটার আগেই বের হয়ে গেলাম বিএসএমএমইউ এর ফিভার ক্লিনিকে স্যাম্পল দিতে। ১৭ মে ২০২০ এ গিয়ে দেখি সকাল পাঁচটায় পুলিশ আর ফায়ার ব্রিগেডের লোকদের বিশাল লাইন সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের লাইনে। তাও দাঁড়িয়ে রইলাম, সকাল আটটায় টোকেন দেয়া হলো, জানলাম প্রায় ছয়-সাত জনের জন্য সিরিয়াল পেলাম না। ঐদিন সকাল আটটা থেকে অনলাইনে পরের দিনের জন্য সিরিয়াল নেয়ার কথা থাকলেও অনলাইনে কিছু পেলাম না। বাসায় ফিরে আসলাম প্রচন্ড ক্লান্ত হয়ে। PRAAVA Health এর পরীক্ষার ফলাফল ২৪ ঘন্টায় পাবার কথা থাকলেও, ওরা তা না দেয়ায় চিন্তায় আগের দুই রাতেও ঘুম হয়নি একদম।

২য় স্যাম্পল (সর্বমোট ৩য়) আমার এক কলিগের বাসায় তার পরিচিত বড়ভাই এর মাধ্যমে সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে স্যাম্পল নিতে আসার কথা ছিলো, ফোন দিয়ে দেখলাম তখনো তিনি স্যাম্পল দেননি। তাকে ফোন দিলাম, তিনি সাথে আমার স্যাম্পল দেয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। ১৭ মে ২০২০ ২য় স্যাম্পল দিলাম, তারা জানালো ৭২ ঘন্টার মধ্যে ফলাফল পাওয়া যাবে।

৩য় স্যাম্পল (সর্বমোট ৪র্থ) রাতে ফেসবুকে এক কলিগের সাথে কথার সময়ে বিএসএমএমইউ থেকে ফিরে এসেছি বললে তিনি বললেব অনলাইন এপয়েন্টমেন্টের কথা, আমি বললাম সকাল থেকে চেক করেছি। ওরা তো দেয়নি। তাও আবার চেক করতে গিয়ে দেখি যে অনলাইনে এপয়েন্টমেন্ট নিচ্ছে। সাথে সাথে একটা এপয়েন্টমেন্ট দিলাম। ওরা মোবাইলে কনফার্মেশন মেসেজ দিলো। নির্ধারিত সময়ে স্যাম্পল দিতে গিয়ে দেখলাম ভীড় নেই। ঝামেলা মুক্তভাবে ২০-২৫ মিনিটের মধ্যেই স্যাম্পল দিয়ে আসলাম ১৮ মে ২০২০ তারিখে।

বিএসএমএমইউ সাধারণত দিনে দিনে ফলাফল দিলেও, এদিন ওরা দিনে দিনে ফলাফল দেয়নি। ২য় স্যাম্পল কোভিড১৯ নেগেটিভ রেজাল্ট পেলাম ১৯ মে ২০২০ বিকেল ৫.০০ টায়, ফোন করে জানালো। আর বিএসএমএমইউ এর টেস্টের কোভিড১৯ নেগেটিভ রেজাল্ট দিলো ১৯ মে ২০২০ রাত ৯.৫০ এ এসএমএস করে। পরপর তিনটা নেগেটিভ রিপোর্ট পেলেও আরও দুইদিন আইসোলেশনে থাকলাম। আইসোলেশনে যাওয়ার ২৩ দিন পর বের হলাম ঘর থেকে। রিকভার করছি খুব আস্তে আস্তে, শরীরে প্রচন্ড দুর্বলতা। যাই হোক এখন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংক্ষেপে দিবো আলাদা আলাদা করে ট্র্যাক রাখতে পারার সুবিধার্থে।

জরুরী জিনিস যা সংগ্রহে রাখতে হবে

আইসোলেশানে থাকার সময় কয়েকটি জিনিস অতীব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বাসায় না থাকলে সংগ্রহ করে রাখতে পারেন।

পালস অক্সিমিটার, ব্লাড প্রেশার মনিটর, ব্লাড সুগার মনিটর, নেবুলাইজার। যাদের ডায়াবেটিস নেই তারাও ব্লাড সুগার মনিটর সংগ্রহ করে রাখতে পারেন, উহান ভিত্তিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে অনেকের কোভিড১৯ ইনডিউসড ডায়াবেটিস দেখা দিয়েছে। অবশ্যই একজন ডাক্তারের সাথে আগে থেকেই যোগাযোগ করে রাখবেন, বিপদে আপদে যেকোন সময় যাকে রিচ করতে পারবেন।

কি কি করবেন এবং করবেন না

কোভিড১৯ ম্যানেজমেন্টে সব ডাক্তারই মোটামুটি একই ধরণের ঔষধ সাজেস্ট করেন। যেহেতু স্পেসিফিক কোন ঔষধ নেই, কোভিড১৯ ম্যানেজমেন্টে তাই দৈনন্দিন জীবনাচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাভাবিক সুষম খাবার, কমপক্ষে ১০০-১৫০ গ্রাম প্রাণীজ আমিষ রাখার চেষ্টা করতে হবে, মাছ খাওয়া বেটার। প্রচুর পানি পান করতে হবে, সাথে ভিটামিন সি যুক্ত ফল ও ফলের রস খেতে হবে।

দৈনিক ৪-৫ বার গরম পানির ভাপ নিতে হবে কমপক্ষে ৬-৮ মিনিট করে। ডাক্তারদের ভাষ্যমতে গরম পানির ভাপ শরীরের ভেতরের ভাইরাস পুরোপুরি না মারতে পারলেও শ্বাসনালী পরিষ্কার রাখে এবং ভাইরাল লোড কমায়।

দৈনিক ৪-৫ বার কমপক্ষে ৫০০ এমএল চা (আদা, লবঙ্গ ও অন্যান্য মশলা সহযোগে) পান করতে হবে। চা বাদেও আদা, লবঙ্গসহ বিভিন্ন মসলা মিশিয়ে গরম পানীয় তৈরী করে পান করতে পারেন।

অবশ্যই প্রত্যেকদিন গোসল করবেন, গরম পানি দিয়ে গোসল করা শরীরের জন্য ভালো এবং বেশ আরাম পাওয়া যাবে।

অবশ্যই সময় মতো ঘুমাতে হবে। দিনে কমপক্ষে ০৮ঘন্টা ঘুম নিশ্চিত করতে হবে। এতে রিকোভারি সহজ হবে।

তেলে ভাজা খাবারসহ সকল জাংক খাবার পরিহার করতে হবে। ধূমপান অবশ্যই পুরোপুরি বাদ দিতে হবে এ সময়ের জন্য হলেও। ঠান্ডা বা রুম তাপমাত্রার পানিও পান করা যাবে না, পানি কুসুম গরম অবস্থায় পান করা ভালো। বুক ও গলা কোন অবস্থাতেই ঘামতে দেয়া যাবে না, ঘেমে গেলেও সাথে সাথে কাপড় দিয়ে মুছে ফেলতে হবে।

কি কি ঔষধ খেয়েছি (ডাক্তারের সাথে পরামর্শ বাঞ্ছনীয়)

আমার ডাক্তার যা ঔষধ প্রেস্ক্রাইব করেছিলেন সুবিধার জন্য সেভাবেই দিচ্ছি:

1. Hydroxychloroquine Sulphate 200 mg-2 times Daily -5 days (সম্প্রতি ডব্লিউএইচও এটার ব্যবফার সীমিত করতে উপদেশ দিয়েছে যা আমি আমার ডাক্তার এর কাছ থেকে ভেরিফাই করেছি) 2. Azithromycin-500 mg- 2 times -5 days 3. Ivermactin (Tab Scabo/ Ivera (6 mg -3 tab stat (single dose) 4. Montelukast Sodium 10 mg-once Daily 5. Paracetamol-if fever. 6.Tab. Cavic C-once Daily -10 days 7. Tab Zinc B 2 times Daily. -10 days. 8. Iodin 1% Mouthwash 9. Vitamin D+ Calcuim 600mg+400 IU  10. Windel Plus 3ml for Nebulizer

এর মধ্যে রিকোনিল (হাইড্রক্সি ক্লোরোকুইন সালফেট) খাবার আগে আমার ইসিজি দেখে নিয়েছিলেন। আমার সম্প্রতি অন্য একটা কারনে ইসিজি করানো ছিলো। ডাক্তারের পরামর্শে এজিথ্রোমাইসিন ৭ দিন খেয়েছিলাম। বিশেষ সতর্কতাঃ কেউ কোন ঔষধ গ্রহণ করার আগে অবশ্যই একজন রেজিস্টার্ড ডাক্তারের পরামর্শ নিবেন।

রুকিয়াহ হিসেবে কি করেছি (আমার কোন অভিজ্ঞতাই নেই, অন্য একজনকে ফলো করেছি)

এ বিষয়ে আমার কোন বিশেষ অভিজ্ঞতা নেই, আমার এক মেয়ে বন্ধু একটা ইসলামিক গ্রুপ থেকে কালেক্ট করে দিয়েছিলো। আমি এটা থেকে বেশ উপকার পেয়েছি তাই শেয়ার করছি। কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই এটার, বিশ্বাস ছাড়া। তো শেয়ার করি:

রেসিপির জন্য নিলাম: ১। কালোজিরা (দুই চামচ), ২। জিরা (দুই চামচ), ৩। লবঙ্গ (দুই চামচ), ৪। মেথি (দুই চামচ), ৫। যয়তুন তেল (দুই চামচ), ৬। মধু (দুই চামচ)।

কালোজিরা, জিরা, মেথি ও লবঙ্গ ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করলাম আর মধু আর যয়তুন ঢেলে পেষ্ট বানিয়ে নিলাম। পেষ্ট হয়ে এলে একটি পাত্রে ঢেলে রেখে দিলাম।

৭বার সূরা ফাতিহা, ৭বার দরূদ, ৭বার আয়াতুল কুরসি, ৩ ক্বুল ৩ বার করে, সকাল বিকালের নিরাপত্তার দুআগুলো পড়ে তাতে ফুঁক দিলাম। এরপর এই দু’আটি “ওয়া ইযা মারিদ্বতু ফাহুয়া ইয়াশফীন (আর আমি যখন অসুস্থ হই, তিনিই আমাকে সুস্থ করেন।)” পড়ে চামচে তুলে অল্পে অল্প করে জিহবাতে নিয়ে আস্তে আস্তে গিলতে লাগলাম। সাথে গরম পানি রেখেছিলাম। আল্লাহ্‌র রহমতে এই আমলে আমার বেশ উপকার হয়েছে। কোন উপসর্গ দেখা দিলে মিক্সচারটা খেলে সাথে গরম পানি পান করলে বেশ ভালো বোধ হতো। যারা রুকিয়া ফলো করতে ইচ্ছুক শুধুমাত্র তাদের জন্যই এই প্যারা, এর কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই আগেই বলে রেখেছি, এটা বিশ্বাসের প্র্যাকটিস।

মানসিক চাপ কিভাবে সামলাবেন/সামলিয়েছি

মানসিক দিক কোভিড১৯ এর একটি বড় দিক, শারীরিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য মানসিক সুস্থতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোভিড১৯ আপনার শরীর ও মনে ইতোপূর্বে আপনি কখনো সম্মুখীন হননি এমন চাপ ফেলবে। শুরু থেকেই পজিটিভ থাকা আপনাকে হেল্প করবে অনেকখানি। এছাড়া, যে যার ধর্মে বিশ্বাসে সে অনুযায়ী প্রার্থনা মানসিক প্রশান্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্যানিক এটাক আমাদের দেশে নতুন টার্ম হলেও ইউরোপ আমেরিকায় অনেকেই অভ্যস্ত এটাতে।

আইসোলেশনের সময় একা একা থাকতে এমনিতেই একটা মানসিক চাপ তৈরী হয়। এর মধ্যে রোগের বিভিন্ন উপসর্গ, সেরে উঠা নিয়ে দুশ্চিন্তা, আপনজন কেউ আক্রান্ত হলো কি না, আবার কাউকে দেখতে পারবো কি না, গুরুতর অসুস্থ হবো কি না, অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা কি হবে এইসব বিবিধ বিষয় অবচেতন মনে প্রচন্ড চাপ তৈরী করে। যা অবচেতন মন বিভিন্নভাবে রিলিজ করার চেষ্টা করে। তার মধ্যেই একটা হচ্ছে প্যানিক এটাক বা এংজাইটি এটাক।

উপরেই বলেছি এর ক্লাসিক উপসর্গ হচ্ছে শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ দেওয়া, হাত-পা অসাড় হয়ে আসা, শরীরে ঘাম দেয়া ইত্যাদি। এগুলো আবার সিভিয়ার কোভিড-১৯ রোগের ও উপসর্গ। তাই উপসর্গ আলাদা না করতে পারলে প্যানিক এটাক অনেক বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। আমার ডাক্তারের পরামর্শে এরকম  হলে আমি আমার অক্সিজেন স্যাচুরেশন মনিটর করতাম। অক্সিজেন স্যাচুরেশন যদি স্বাভাবিক লেভেলে থাকে তাহলে প্যানিক এটাক নিয়ন্ত্রণে যেসব ব্যবস্থা নেয়া দরকার তা ইমিডিয়েট শুরু করা। আমি যা করতাম, বুকের উপর ভর দিয়ে শুয়ে বড় করে শ্বাস নিয়ে কিছুক্ষণ আটকে রেখে আস্তে আস্তে ছাড়া, ডাক্তারের প্রেস্ক্রাইব করা এংজাইটি মেডিসিন (ক্লোনাজিপাম ০.৫ এমজি) খেয়ে চুপচাপ ঘুমানোর চেষ্টা করা।

শুরু থেকেই দুশ্চিন্তায় লাগাম পরানোর কিছু উপায় বলি যা আমি কাজে লাগিয়েছি। পুরনো বন্ধুদের সাথে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় আড্ডা দেয়া, পারলে হাস্যরসাত্নক কনটেন্ট, সিনেমা দেখা, খুব উত্তেজনাপূর্ণ সিনেমা, সিরিজ ইত্যাদি দেখা থেকে বিরত থাকা। এছাড়া করোনা ভাইরাস সম্পর্কিত যেকোন ইন্টারনেট কন্টেন্ট থেকে দূরে থাকা। যেকোন অসুবিধায় ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করুন, ইন্টারনেটে ভুলেও সমাধান খুঁজতে যাবেন না। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে।

এছাড়া আরও চিন্তা মুক্ত থাকতে বেশি অসুস্থ হলে কোন হাসপাতালে যাবেন সেটা আগে থেকেই ঠিক করে রাখা, পারলে এ ব্যাপারে হেল্প করতে পারবেন এমন কারও সাথে কথা বলে রাখা, এম্বুলেন্সের ব্যবস্থা নিশ্চিত করে রাখা, এমন একজন সুহৃদকে ঠিক করে রাখা যাকে রাত বিরাতে ফোন করে সাহায্য চাইতে পারবেন, এবং সে সুহৃদ অবশ্যই নিজ বাসার বাইরে হতে হবে। এইসব ব্যবস্থা আগে থেকে নিশ্চিত করে রাখতে পারলে অনেক মানসিক চাপ কমে যাবে।

কিছু সাধারণ জিনিস যা করোনাকালীন আইসোলেশনের পূর্বে জানা থাকা ভালো

এবার এমন কিছু জিনিস ছোট ছোট পয়েন্ট আকারে শেয়ার করছি যা জানা থাকলে আপনি মানসিকভাবে অনেক প্রস্তুত থাকবেন। আমি নিজে ফিল করেছি এমন কোন ডকুমেন্ট কেন নেই? লেখার মূল ভাব আরেকটা আর্টিকেল থেকে অনেকটা নেয়া হয়েছে। যাই হোক শুরু করি:

১) আপনার সবধরণের উপসর্গই থাকতে পারে। মানে একসঙ্গে একাধিক, এমনকি দশটি উপসর্গও থাকতে পারে। কিছু উপসর্গ এখানে দিচ্ছি গলা ব্যথা, গলায় খুশখুশে অনুভূতি, হাচি, সর্দি-কাশি, জ্বর, বমি, ক্লান্তিবোধ, শরীর ব্যাথা, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরানো, বুকে ব্যথা, বুক ধড়ফড়, চোখে ঘোলা দেখা, স্বাদ এবং গন্ধের অনুভূতি হারিয়ে ফেলা, শরীর ও মাংশপেশী ব্যথা, বিভিন্ন অস্থিসন্ধিতে ব্যাথা, হাত পায়ে শিরশিরে অনুভূতি হওয়া, পেট ব্যথা, পাতলা পায়খানা, কোমড় ব্যাথা, নিদ্রাহীনতা বা ইনসোমনিয়া, ক্ষুধামন্দা ইত্যাদি হতে পারে। আমার নিজের একসাথে ছয়টি উপসর্গ ছিলো, যার কিছু এখনও আছে। আপনার যদি সন্দেহ হয় যে আপনি কোভিড১৯ এ এক্সপোজড হয়েছেন বা হবার মতো কারণ থাকে এবং উপরের যেকোন ধরণের উপসর্গ থাকে তাহলে পরিবারের অন্য সদস্যদের নিরাপত্তায় তৎক্ষণাৎ নিজেকে আইসোলেট করে ফেলুন। এরপর পারলে টেস্ট করার ব্যবস্থা করুন। কিন্তু অবশ্যই নিজেকে পজিটিভ ধরে নিয়ে চিকিৎসা শুরু করে দিন। এখন পর্যন্ত যেসকল ঔষধ ব্যবহৃত হয়েছে বা হচ্ছে সবই প্রথমদিকে নেয়া শুরু করলে বেশি ইফেক্টিভ হয় বলেই প্রমাণ মিলেছে, ইনফেকশনের অবস্থা গুরুতর পর্যায়ে গেলে আসলে প্লাজমা থেরাপি ছাড়া এখন পর্যন্ত কোন ইফেক্টিভ উপায় নেই।

২) প্রত্যেকের উপসর্গ ভিন্ন হতে পারে। একজনের সাথে অন্য জনের উপসর্গ মিলে যাবে এটা আশা করা ভুল। করোনার বিস্তৃত ধরণের উপসর্গ থাকায় টেস্ট করা ছাড়া নিঃসন্দেহ হবার কোন উপায় নেই। সবার উপসর্গ যেমন আলাদা, ইনফেকশনের ধরন বা সেরে উঠার ধরন আলাদা হবে। কেউ ১০-১৪ দিনেই সুস্থ হয়ে যাবে, কারও আরও বেশি সময় লাগবে। এটাই স্বাভাবিক।

৩) কোভিড১৯ এর এক্সপেরিয়েন্স রোলার কোস্টার রাইডের মতো। একদিন খুব ভালো ফিল করবেন তো আরেকদিন মনে হবে যে আর বাঁচবেন না। এক ঘন্টা আগেও মনে হবে ভালো হয়ে গেছেন, এক ঘন্টা পরে মনে হবে আগের চেয়েও অবস্থা খারাপ হয়েছে। এমনকি নতুন নতুন উপসর্গও দেখা দিতে পারে ভালো হয়ে উঠা বা সেরে উঠার সময়েও। এটা আগে মেনে নিলেই কোভিড১৯ ম্যানেজ করা সহজ হয়ে যাবে। শরীর একটু ভালো বোধ হলেই শরীরের উপর বেশি চাপ দেয়া যাবে না। তাহলে হিতে বিপরীত হতে পারে।

৪) আপনাকে সব ধরণের খারাপ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই যেতে হবে। সহজ ইংরেজিতে বললে You’re going to feel all the feelings অর্থাৎ আপনার ভয় লাগবে, দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হবেন, হতাশা গ্রাস করবে, মাঝে মাঝে অসহায় বোধ করবেন, কোন কারণ ছাড়াই অনেক রাগ লাগবে। এগুলোকে একটু শক্ত হাতে ম্যানেজ করলে মুদ্রার অপর পিঠে দেখবেন আপনার কাছের মানুষ, বন্ধু বান্ধব আপনার জন্য কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা, আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে অপেক্ষায় আছে।

৫) ধরেই নিতে হবে অনেক দিন আপনাকে অসুস্থ থাকতে হবে বা সেরে উঠতে সময় লাগবে অনেক। কোভিড১৯ আক্রান্তের বেশিরভাগই স্বল্প সময়ে (দুই সপ্তাহের মধ্যে) সুস্থ হয়ে উঠলেও পুরোপুরি সেরে উঠতে বা আগের অবস্থায় যেতে অনেক সময়ের দরকার হবে, গ্রাজুয়ালি উন্নতি হবে, হয়তোবা সেরে উঠে আবার অসুস্থ হয়ে পরবেন। শরীর একটু ভালো লাগায় শরীরের উপরে বেশি চাপ দিলে তা আপনাকে দ্রুত সুস্থ করার বদলে সুস্থ হবার প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘায়িত করবে।

৬) মেনে নিন এ বিষয়ে কেউই এক্সপার্ট বা বিশেষজ্ঞ নন (এটলিস্ট এখন পর্যন্ত)। তাই দুই জন ডাক্তারের মতে ভিন্নতা থাকতেই পারে। প্রতিদিন নতুন নতুন তথ্য যোগ হচ্ছে মেডিক্যাল সায়েন্সের তথ্য ভান্ডারে। মেডিক্যাল প্রফেশনেও কাছকাছি সময়ে এরকম একটা শক আসেনি। ডাক্তারের মতে ভিন্নতা থাকলেই যে ডাক্তাররা আপনাকে ভুল তথ্য দিচ্ছেন তা না। ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় একই ঔষধের ভিন্ন প্রটোকল অনুসরণ করা হচ্ছে। নতুন তথ্য পাওয়ার সাথে সাথে চিকিৎসার ধরণ, ঔষধ সেবনের প্রটোকল ইত্যাদিতে পরিবর্তন আসছে। তাই ডাক্তারের উপর অবশ্যই ভরসা রাখতে হবে। তারা আমাদের নন-মেডিকেল পার্সোনেলদের চেয়ে অবশ্যই বেশি হালনাগাদ তথ্য রাখছেন।

৭) আপনার কাজ আপনি ঠিকমতো করুন। অর্থাৎ আপনার ডাক্তার আপনাকে যেভাবে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন সেভাবে চলুন। অবশ্যই প্রচুর পানি বা পানীয় পান করুন (সহজ ইংরেজিতে Hydrate, hydrate, hydrate, and be sure to include electrolytes)। ডাবের পানি ইলেক্ট্রোলাইটের একটা ভালো উৎস, তবে অবশ্যই ঠান্ডা পানীয় পরিহার করুন। এছাড়া প্রচুর বিশ্রাম নিন, ইংরেজিতে জোর দিতে বলা হয় REST, REST, REST  অর্থাৎ বিশ্রাম, বিশ্রাম এবং বিশ্রাম।

৮) হাতের কাছে যতোসম্ভব প্রয়োজনীয় টুলস রাখুন এবং ব্যবহার করুন। অক্সিমিটার, ব্লাড প্রেসার মনিটর, ব্লাড সুগার মনিটর ইত্যাদি দিনে কয়েকবার ব্যবহার করুন। শ্বাসকষ্ট থাকলে নেবুলাইজার ব্যবহার করুন। অনুকূল রিডিং আপনাকে মানসিক রিলিফ দিবে, অনুকূল রিডিং না পেলে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করা সহজ হবে এবং বিপদজনক অবস্থায় পৌছাবার পূর্বেই ইমার্জেন্সী মেডিকেল কেয়ার নিতে পারবেন।

৯) শারীরিক ভাবে সক্রিয় থাকুন। আইসোলেশনের সময়ে শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা গুরুত্বপূর্ণ। এতে মানসিক চাপ কমে ও শরীর ভালো থাকে। দৈনিক কমপক্ষে আধাঘন্টা হালকা ব্যায়াম, ইয়োগা করা যেতে পারে। সহজ হালকা ব্যামের ভিডিও ইউটিউবে খুব সহজেই পাওয়া যায়।

১০) রিল্যাক্স ফিল করেন। এসময়ে মানসিক চাপ এবং দুশ্চিন্তা স্বাভাবিকভাবেই আসবে। নিজে থেকেই দুশ্চিন্তা করে স্ট্রেস আরও না বাড়িয়ে অন্য কোন কাজে সময় কাটান। আপনার যা করতে ভালো লাগে তা করে সময় কাটান, ট্রাভেল ডকুমেন্টারি দেখেন। নতুন কোন জায়গায় যাবার প্ল্যান করেন। যে ফোন কলগুলি আপনার স্ট্রেস বাড়াতে পারে সেগুলো রিসিভ করা বাদ দেন। সর্বোপরি যা আপনাকে রিলাক্স করে, মন দুশ্চিন্তা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে তাই ই করুন।

কিছু জরুরী যোগাযোগ

করোনা রোগী পরিবহন সংক্রান্ত এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের ফোন নাম্বার: আবির এ্যাম্বুলেন্স (ঢাকাসহ যেকোন জেলা) ০৬ টি এ্যাম্বুলেন্স, ফোন: ০১৯২১১৮৯২৮৯, ০১৭৮৬৪৯২২১৭। আব-দ্বীন এবং কনসাস এ্যাম্বুলেন্স ০২ টি এ্যাম্বুলেন্স, ফোন: ০১৭৮৭৬৬৫৯০৭, ০১৯১১৫৩৮২৫১। আদিবা এ্যাম্বুলেন্স ০১ টি এ্যাম্বুলেন্স, ফোন: ০১৭১২১৩১৮৩৪। আল-সাকিব এ্যাম্বুলেন্স ০৩ টি এ্যাম্বুলেন্স, ফোন: ০১৭১১০৬০০২৫। এআর এ্যাম্বুলেন্স ০৫ টি এ্যাম্বুলেন্স, ফোন: ০১৮৭৬২১৩৩৩৮। বাশার এ্যাম্বুলেন্স ০২ টি এ্যাম্বুলেন্স, ০১৭১৯৫৭০৮৭৬। বেষ্ট কেয়ার এ্যাম্বুলেন্স ০৬ টি এ্যাম্বুলেন্স, ফোন: ০১৯১১০০৮১১৮। দবির এ্যাম্বুলেন্স ০৫টি এ্যাম্বুলেন্স, ফোন: ০১৭১৬৫২৩৫৭৬, আব্দুল এ্যাম্বুলেন্স ০২টি ফোন: ০১৭২৪৪৬৪৪২২।

কোভিড১৯ এ আক্রান্ত মৃত ব্যক্তির লাশ বহনকারী এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের নম্বর: ঢাকা এ্যাম্বুলেন্স (লাশবাহী) ০৪টি ফোন: ০১৭১৪৩২৫৩২৫, আল মারকাজুল ইসলামী এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস ০৩ টি ফোন: ০১৩১৬১১১৬৮৮।

ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতালের তথ্য, যা জাতীয় করোনা ইনফো ওয়েবপেজ থেকে সংগৃহীত।

প্রতিষ্ঠানের নামফোন
শেখ হাসিনা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি 
মুগদা জেনারেল হাসপাতাল+88 02 7276032
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ৯১৩০৮০০-১৯
শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল 
কুয়েত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল১৯৯৯৯৫৬২৯০
বাংলাদেশ রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতাল8802-55007420
মহানগর জেনারেল হাসপাতাল০২৫৭৩৯০৮৬০, ০২-৭৩৯০০৬৬
লালকুঠি হাসপাতাল, মিরপুর০২-৯০০২০১২
সাজিদা ফাউন্ডেশন, মিরপুর১৭৭৭৭৭১৬২৫
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল১৮১৯২২০১৮০
জিনজিরা ২০ শয্যার হাসপাতাল 
আমিন বাজার ২০ শয্যার হাসপাতাল০১৭০০০০০০০০, ০১৭১২২৯০১০০
 কামরাঙ্গীরচর ৩১ শয্যার হাসপাতাল১৭২৬৩২১১৮৯
শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতাল 
বক্ষ ও হাসপাতালের জাতীয় রোগ ইনস্টিটিউট (এনআইডিএইচসি)88-02-55067131 – 40
রিজেন্ট হাসপাতাল, মিরপুর+88 02-9033057, +88 01971239652
রিজেন্ট হাসপাতাল, উত্তরা+88 02-8931133 , +88 01971-239652
কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল55062201, 55062350, 55062349, 01769010200
রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতাল01796-500117

জাতীয় তথ্য বাতায়নের সকল নম্বর (হটলাইন): ৩৩৩ জাতীয় কল সেন্টার , ১৬২৬৩ স্বাস্থ্য বাতায়ন, ১০৬৫৫ আইইডিসিআর, ০৯৬১১৬৭৭৭৭৭ বিশেষজ্ঞ হেলথ লাইন , ১০৯ জাতীয় হেল্পলাইন।

প্রাইভেট হাসপাতাল যেখানে কোভিড ১৯ এর আরটি-পিসিআর টেস্ট করানো যাবে তার তালিকা:

এভার কেয়ার হাসপাতাল (প্রাক্তন এপোলো হাসপাতাল), ঢাকা; স্কয়ার হাসপাতাল, ঢাকা; প্রাভা হেলথ বাংলাদেশ; ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা; আনোয়ার খান মডার্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা; এনাম মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতাল, ঢাকা; ইউনাইটেড হাসপাতাল লিমিটেড, ঢাকা; বায়োমেড ডায়াগনস্টিকস, ঢাকা; ডিএমএফআর মলিকিউলার ল্যাব এন্ড ডায়াগনসস্টিকস , ঢাকা; কেয়ার মেডিকেল কলেজ, ঢাকা; টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ ও রাফাতুল্লাহ কমিউনিটি হাসপাতাল, বগুড়া; শেভরন ক্লিনিক্যাল ল্যাবরেটরি (পিটিই) লিমিটেড, চট্টগ্রাম।


নভেল করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) ও আমার অভিজ্ঞতা 1

মোঃ আতিকুর রহমান হিমু, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিবেশ বিজ্ঞানে মাস্টার্স করেছেন। বর্তমানে কর্মরত আছেন বাংলাদেশ ব্যাংকে, ডেপুটি ডিরেক্টর হিসেবে।

মতামত দিনঃ