সাধারণত গরম আবহাওয়া বা গ্রীষ্মমন্ডলীয় দেশের অ্যাকুরিয়ামে পালিত মাছের বিভিন্ন ধরণের রোগের মধ্যে ফাংগাল ইনফেকশন বা ছত্রাকের আক্রমণ অন্যতম। যেহেতু গরম আবহাওয়া বা গ্রীষ্মমন্ডলীয় দেশের প্রায় সব অ্যাকুরিয়ামেই ছত্রাকে বীজ (Spore) সুপ্ত অবস্থায় থাকে, তাই এরা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে অ্যাকুরিয়ামে উপনিবেশ (Colony) তৈরি করতে পারে আর স্ট্রেসড, ইনজুরড বা অসুস্থ মাছগুলিতে খুব সহজেই আক্রমণ করতে পারে।

অ্যাকুরিয়ামে পানির গুণাগুন (Water Quality) যদি খারাপ হয়ে থাকে তাহলে পরিস্থিতি আরোও খারাপ দিকে যেতে পারে এবং খুব কম সময়ের মধ্যেই অ্যাকুরিয়ামে থাকা সুস্থ-সবল মাছগুলোকে আক্রান্ত করতে পারে। আশার কথা হচ্ছে, বেশিরভাগক্ষেত্রেই অ্যাকুয়ারিস্টরা সহজেই ইনফেকশন বা ছত্রাকের আক্রমণ বাইরে থেকে দেখেই বুঝতে পারে।

১০০% এর মধ্যে ৯৫% ক্ষেত্রেই ছত্রাকের আক্রমণের লক্ষণ মাছের গায়ে সাদা ফুঁয়োফুঁয়ো (Fluffy) এর মতোন দেখা যায় যা কিনা কটন উল ডিসিজ (Cotton Wool Deases) নামেও পরিচিত। এছড়াও সংক্রমণের মাত্রার উপর নির্ভর করে ছত্রাকে রঙ ধূসর এমনকি লালও হতে পারে।

অ্যাকুরিয়ামে পালিত মাছের ফাংগাল ইনফেকশন এবং তার চিকিৎসা 1

বিভিন্ন ধরণের ফাংগাল ইনফেকশন

সৌভাগ্যবশত, প্রায় সবধরণের ফাংগাল ইনফেকশন বা ছত্রাকের আক্রমণ শুধুমাত্র মাছ এবং মাছের ডিমের বাইরের আবরণ বা টিস্যুতে হয়ে থাকে। বেশিরভাগক্ষেত্রে ছত্রাকের আক্রমণ আগের কোনো সংক্রমণ থেকে হয় বা মাছের শরীরে আগের কোনো আঘাতের ফলাফল থেকে হয় আর সেজন্যেই সংক্রামিত মাছের সঠিক চিকিৎসার জন্য ২ ভাগে ভাগ করে এর চিকিৎসা করা হয়। কিছু ছত্রাকের আক্রমণ মাছের শরীরের ভিতরের অঙ্গগুলোকে সংক্রমিত করে তবে সেগুলো নিয়ে অন্য কোনো সময় আরোও বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে।

একটি অ্যাকুরিয়ামের বেশিরভাগ জায়গা জুড়েই ছত্রাক-এর বীজ সুপ্ত অবস্থায় থাকে তবে নিচের দেয়া বিষয়গুলো ছত্রাক আক্রমণের পরিমাণ বেড়ে থাকেঃ

১. বাজে গুণাগুনের পানি (Poor Water Quality)

অ্যাকুরিয়ামে পালিত মাছের ফাংগাল ইনফেকশন এবং তার চিকিৎসা 2
বাজে গুণাগুনের পানি

২. অ্যাকুরিয়ামে মাছের স্বাস্থ্য ভালো থাকার পরিবেশ না থাকা

অ্যাকুরিয়ামে পালিত মাছের ফাংগাল ইনফেকশন এবং তার চিকিৎসা 3
অ্যাকুরিয়ামে মাছের স্বাস্থ্য ভালো থাকার পরিবেশ না থাকা

৩. আহত মাছ বা রোগাক্রান্ত মাছ থাকা

অ্যাকুরিয়ামে পালিত মাছের ফাংগাল ইনফেকশন এবং তার চিকিৎসা 4
আহত মাছ বা রোগাক্রান্ত মাছ

৪. অ্যাকুরিয়ামে মরা মাছ বা প্রচুর পরিমাণে পঁচনশীল জৈব পদার্থ পড়ে থাকা

অ্যাকুরিয়ামে পালিত মাছের ফাংগাল ইনফেকশন এবং তার চিকিৎসা 5
অতিরিক্ত পরিমাণে খাবার খাওয়ানো।

যে অ্যাকুরিমগুলোতে বারবার ফাংগাল ইনফেকশন বা ছত্রাকের সংক্রমণ হয়েছে সে অ্যাকুরিয়ামগুলোতে মাছের স্বাস্থ্য ভালো থাকার পরিবেশ, ফিল্ট্রেশন এবং পানির গুণাগুন পরীক্ষা করে দেখা উচিৎ। যে অ্যাকুরিয়ামে মাছের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ থাকে তাতে খুব কম পরিমাণেই ছত্রাকের আক্রমন দেখা দেয়।

কটন উল ডিজিজ (Cotton Wool Deases):

কটন উল ডিজিজ” ছত্রাক সংক্রমণের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ রোগ যা কিনা মাছের ত্বক, পাখনা ও মুখে সংক্রমিত হয়ে থাকে। যেসব মাছের আগে ইনকেশন হয়েছে, পরজীবী দ্বারা আক্রান্ত বা ইনজুরড (জখম) হয়ে আছে এমন জায়গাগুলিতে সাদা রঙের ফুঁয়োফুঁয়ো (Fluffy) হয়ে উপনিবেশন তৈরি করে এবং বেশ দ্রুতই সারা শরীরে বিস্তার লাভ করে। এই ধরণের সংক্রমণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রমণশালী ছত্রাক হলো Saprolegnia এবং Achyla। এছাড়া অন্যান্য ছত্রাকের কারণেও এই ধরণের সংক্রমণ হতে পারে এবং সংক্রমণের জায়গায় একাধিক প্রজাতির ছত্রাকের উপস্থিতি থাকতে পারে।

মিষ্টি পানির মাছের কটন উল ডিজিজ রোগের চিকিৎসার জন্য ফ্রেশওয়াটার অ্যাকুরিয়াম লবণ ব্যবহার করে থাকে এবং সাথে বাজারে বেশ কিছু অ্যান্টিফাঙ্গাল লিকুইড ঔষধ পাওয়া যায়। এছাড়া অনেকক্ষেত্রে পুরো অ্যাকুরিয়াম একবার খালি করে সল্টবাথ দেয়া হয়ে থাকে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুরো অ্যাকুরিয়ামে ট্রিটমেন্ট দেয়া হয়, আবার যদি আক্রান্ত মাছের সংখ্যা কম থাকলে মাছটিকে বা মাছগুলোকে আলাদা হসপিটাল অ্যাকুরিয়ামে আলাদাভাবে ট্রিটমেন্ট দেয়া হয়। অ্যান্টিফাঙ্গাল ঔষধ হিসেবে আমাদের দেশের বাজারে বেশ কিছু লিকুইড ঔষধ পাওয়া যায়। আমাদের কাছে এইসব ঔষধের মধ্যে বিশেষভাবে API PIMAFIX এবং API FUNGUS CURE এর কার্যক্ষমতা ভালো লেগেছে।

অ্যাকুরিয়ামে পালিত মাছের ফাংগাল ইনফেকশন এবং তার চিকিৎসা 6

(বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ কম খরচে এই রোগের চিকিৎসা করতে চাইলে আয়োডিন ছাড়া লবণ (যে কোনো ব্র্যান্ডের), রেনামাইসিন ২৫০ মিলিগ্রাম ১ টি ক্যাপ্সুল ৩৭.৮৫ লিটার পানিতে এবং তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখলে ৩-৪ দিনের মধ্যে ভালো ফলাফল আশা করা যায়)।

ডিমের ছত্রাক সংক্রমণ (Egg Fungus):

অ্যাকুরিয়ামে যদি প্রায়শই ডিম দেয়া মাছ থেকে থাকে তাহলে মাছের পাড়া ডিমগুলিতে সাদা সাদা দাগের ছত্রাক দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে। Saprolegnia এবং Achyla এই দুটি জাতের ছত্রাকের দ্বারা এই সংক্রমণটি বেশি হয়ে থাকে। প্রায় সবধরণের অ্যাকুরিয়ামে এই ছত্রাক উপস্থিত থাকে এবং প্রায়ই ক্ষতিগ্রস্থ ও বন্ধ্যাত্বক ডিমগুলিকে সংক্রামিত করে এবং এদের থেকে বেশ তাড়াতাড়িই অন্যান্য স্বাস্থ্যকর ডিমগুলিতে ছড়িয়ে যায়। বেশিরভাগ ডিমপাড়া মাছের প্রজাতিরা তাদের ডিমগুলোকে সুরক্ষিত করার চেষ্টা করে থাকে তাই এরা নষ্ট হয়ে যাওয়া ডিমগুলোকে সাধারণত ধ্বংস করে ফেলার চেষ্টা করে। এই ক্ষেত্রে ডিমের ছত্রাক সংক্রমণ হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুরো ডিমগুলোকেই মাছেরা ফেলে চলে যায় এবং এটা কৃত্তিম পরিবেশে প্রজননের সময় বেশি দেখা যায়।

অ্যাকুরিয়ামে পালিত মাছের ফাংগাল ইনফেকশন এবং তার চিকিৎসা 7
মাছের ডিমে ছত্রাকের আক্রমণ

কোনো ডিম যদি এই ছত্রাক আক্রমণ করে তাহলে আসলে এর কোনো প্র্যাক্টিকাল ট্রিটমেন্ট নেই। আক্রান্ত ডিম বা ডিমগুলোকে সাথে সাথে নষ্ট করে ফেলা উচিৎ। আবার অনেকক্ষেত্রেই অ্যাকুয়ারিস্টরা নষ্ট ডিমের সাথে ভালো ডিমকে গুলিয়ে ফেলে। নষ্ট ডিম চেনাটা এক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তারপরেও অনেকেই ডিমের ছত্রাকের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ বা প্রতিহত করার জন্য মিথাইলিন ব্লু ব্যবহার করে থাকেন।

গিল রট (Gill Rot):

অ্যাকুরিয়ামে পালিত মাছের ফাংগাল ইনফেকশন এবং তার চিকিৎসা 8

এটি কিছুটা অস্বাভাবিক রকমের ছত্রাকের আক্রমণে হয়ে থাকে। আর যখন হয় তখনই যদি এর চিকিৎসা না করা হয় তাহলে এর ফলাফল মারাত্মক খারাপ হতে পারে। এর দ্বারা আক্রান্ত মাছ বাতাসের জন্য পানির উপরে খাবি খায় আর এর গিল শ্লেষ্মা দিয়ে আচ্ছাদিত থাকে এবং গিল ফুলে যায়।

এই ছত্রাকটি সাধারণত Branchiomyces জাতের হয়ে থাকে এবং এর ফলে মাছের গিলটি পুরোই পঁচে যেতে পারে। এই ছত্রাকের আক্রমণটি সাধারণত স্ট্রেসড মাছের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এছাড়াও যেসব অ্যাকুরিয়ামে বেশি মাত্রায় অ্যামোনিয়া বা নাইট্রেট থাকে সেগুলোতে এই ছত্রাকের প্রাদূর্ভাব বেশি হয়। এর চিকিৎসা বেশ কঠিন আমাদের দেশের জন্যে কারণ, এই সংক্রমণের জন্যে “Praziquantal” নামক ঔষধ ব্যবহৃত হয় যা আমাদের দেশে পাওয়া যায় না। আবার এই চিকিৎসা সময় সাপেক্ষও। API PIMAFIX ও API MELAFIX একসাথে ব্যবহার করে দেখা যেতে পারে দ্রুত ফলাফলের আশায়। আমাদের পরামর্শ হলো আপনার অ্যাকুরিয়ামে যাতে অ্যামোনিয়া বা নাইট্রেটের পরিমাণ বেড়ে না যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখুন এবং সুস্থ-সবল মাছ প্রতিপালন করুন।

অ্যাকুরিয়ামে পালিত মাছের ফাংগাল ইনফেকশন এবং তার চিকিৎসা 9

সিস্টেমিক ছত্রাকের সংক্রমণ (Systemic Fungal Infection):

ট্রপিক্যাল অঞ্চলের অ্যাকুরিয়ামের মাছের সিস্টেমিক ছত্রাকের সংক্রমণ বেশ বিরল (Rare) এবং এর জন্য এই রোগের চিকিৎসা করাটা কঠিন। আর এই কারণেই এই রোগের ফলাফল সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না। “Icthyophonus” জাতের ছত্রাকের কারণে সংক্রমণ হয়ে থাকে। আক্রান্ত মাছগুলোকে সাধারণত স্বাস্থ্যহীন অবস্থায় দেখা যায়। আক্রান্ত মাছের সম্পূর্ণ পোস্ট মর্টেম করার মাধম্যেই আসল কারণ জানা যায়। এই রোগে সাধারণত বাজে মানের পানিতে ও পরিবেশে থাকা মাছ আক্রান্ত হয়ে থাকে। কিছুক্ষেত্রে “API PIMAFIX” এর দ্বারা চিকিৎসা দেয়া হয়েও থাকে।

আমরা প্রায়ক্ষেত্রেই জানিনা যে সাধারণ চিরাচরিত ছত্রাকজনিত রোগ যেমন মুখের ছত্রাক এবং লেজ পঁচা রোগ আসলে ছত্রাকের সংক্রমণের কারণে হয় না বরং এগুলো আসলে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনের কারণে হয়ে থাকে। বাজারে পাওয়া যায় এমন অ্যান্টিবায়োটিকস এর মধ্যে আমাদের দেশের মধ্যে এরিথ্রোমাইসিন, টেট্রামাইসিন এবং রেনামাইসিন জাতীয় ঔষধ ব্যবহার করা হয় বেশি।

প্রায় সব অ্যাকুয়ারিস্টদেরই এক সময় না এক সময় অ্যাকুরিয়ামে মাছ পালনে ফাংগাল ইনফেকশন বা ছত্রাকের সংক্রমণ মোকাবেলা করতেই হবে। সুবিধা হলো, প্রথমদিকেই যদি রোগের লক্ষণ দেখে রোগ নির্ণয় করা যায় তাহলে ছত্রাকের সংক্রমণ সফলভাবে চিকিৎসা করা যায়। ছত্রাকের সংক্রমণ বিশেষ করে অস্বাস্থ্যকর পানি এবং পরিবেশে বিকাশ লাভ করে এবং রোগাক্রান্ত বা দূর্বল মাছগুলোকে আগে আক্রমণ করে থাকে। যদি আপনি টের পান যে আপনার অ্যাকুরিয়ামের মাছের গায়ে বা ডিমে ছত্রাকের সংক্রমণ হয়েছে তাহলে পরথমেই পানির গুণাগুণ পরীক্ষা করে নিন আর এর সাথে অ্যাকুরিয়ামে মাছের জন্য স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ, প্রাকৃতিক পরিবেশ সরবরাহ করুন।

সবাইকে ধন্যবাদ। মূলত, ইন্টার্নেট এবং নিজেদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই লেখাটি লেখা হয়েছে। যদি এই লেখা সম্পর্কে আপনার কোনো মূল্যবান মতামত থাকে তাহলে অবশ্যই কমেন্ট সেকশনে লিখবেন এবং আপনার জ্ঞান আমাদের সাথে শেয়ার করবেন।

মতামত দিনঃ